নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি দলগুলো

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও ১০০ নারী আসন

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় |পিআইডি

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের বিষয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত। একইভাবে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার সুপারিশেও। কিন্তু, মতভেদ দেখা দিয়েছে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন সংসদের উভয় কক্ষে ভোটের আনুপাতিক (পিআর) হারে নির্বাচন চায়। বিশেষ করে উচ্চ কক্ষে এই দল দু’টির সাথে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি, খেলাফত মজলিসসহ অধিকাংশ দল পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। এমনকি ভোটের হারে (পিআর) সংসদে সংরক্ষিত ১০০ আসন নির্ণয়ের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন। গতকাল সোমবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় বিএনপি আগের রীতিতেই নিম্নকক্ষের ৩০০ আসনে নির্বাচন চায়। আর উচ্চকক্ষের ১০০ আসন ও ১০০ নারী এমপি নিম্নকক্ষের আসন অনুযায়ী বণ্টন চায়। এমতাবস্থায় গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার ১৩তম দিনের আলোচনা সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। আজকেও এই দু’টি বিষয় নিয়ে দলগুলোর সাথে আলোচনা করবে কমিশন। ফলে পূর্বনির্ধারিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিভাবে, কাদের নিয়ে গঠিত হবে- গতকাল সেই আলোচনাতেই যেতে পারেনি কমিশন। আগামীকাল বুধ/ পরশু বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

দিনভর আলোচনা শেষে বিকেলে প্রেস ব্রিফিংকালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সমাজের বিরাজমান বৈচিত্র্যকে প্রতিনিধিত্ব করতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু, কী পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন হবে সে ব্যাপারে ঐকমত্য হওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে কমিশন থেকে দু’টি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, একইসাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায়ও কিছু কিছু প্রস্তাব এসেছে। এসব প্রস্তাব নিয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য স্থায়ীভাবে ১০০ আসন করার ব্যাপারে সবদল একমত হয়েছেন উল্লেখ করে কমিশনের সহসভাপতি বলেন, এ ক্ষেত্রেও পদ্ধতিগত প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। যার ফলে এ পদ্ধতি নির্ধারণে আমরা এখনো একমতের জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। বিদ্যমান ব্যবস্থায় আসন সংখ্যার সংখ্যানুপাতে ৫০ আসন থেকে ১০০ আসনে উপনীত করা বা সরাসরি নারী আসনে নির্বাচন-কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত এই দুই প্রস্তাবে একমত না হওয়ায় বিগত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন থেকে বিকল্প প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি হল, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ভিন্নভাবে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে যেসব রাজনৈতিক দল ২৫টির বেশি আসনে প্রার্থী দেয় তাদের মধ্যে থেকে ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করা। তিনি আরো বলেন, এই প্রস্তাবের বাইরেও আলোচনায় আরো কিছু প্রস্তাব এসেছে। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য কমিশন আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিদ্যমান পদ্ধতিতেই ভোট চায় বিএনপি : এদিকে বিদ্যমান পদ্ধতিতেই জাতীয় সংসদ ও নারী আসনে নির্বাচন চেয়েছে বিএনপি। গতকাল কমিশনের সাথে আলোচনা শেষে ব্রিফিংয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ একথা বলেন। তিনি বলেন, বৈঠকে নারীর ক্ষমতায়ন ও সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে দলটির পক্ষ থেকে বর্তমানে সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসন সংখ্যা ১০০টিতে উন্নীত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একই সাথে নারী আসনে সংবিধানে বিদ্যমান পদ্ধতিতেই ভোটের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, নারী প্রতিনিধিত্ব এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বিএনপি তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছে। এ দু’টি ইস্যুতে কমিশনের আলোচনায় বিএনপি গঠনমূলক প্রস্তাব দিয়েছে এবং বাস্তবতার নিরিখে ধাপে ধাপে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোকে ৩৩ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এখনো আরপিও অনুযায়ী দলের বিভিন্ন কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখতে পারিনি। বাস্তবতা হলো- আমাদের সমাজে অধিকাংশ নারী ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে সরাসরি রাজনীতিতে আসতে দ্বিধা অনুভব করেন। তাই আমরা ধাপে ধাপে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে চাই, ওভারনাইট কোনো বিপ্লবী পরিবর্তন নয়। তিনি আরো বলেন, নারীর সরাসরি নির্বাচন একসময় বাস্তবতা হয়ে উঠবে, কিন্তু এখন ধাপে ধাপে এগোনোই যৌক্তিক।

সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি মোটামুটি ঐকমত্য আছে। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে একমত হওয়া যায়নি। কেউ বলছে নিম্নকক্ষের আসন অনুপাতে প্রতিনিধি আসবে, কেউ বলছে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) হতে হবে। কমিশন এখন এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করবে।

পিআর ছাড়া উচ্চকক্ষে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স সম্ভব নয় বলছে জামায়াত : উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরে দলটির নায়েব আমির ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মূল প্রস্তাব ছিল ভোটারের আনুপাতিক হারে (পিআর বাই দ্য ভোটারস) উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ। আমরা সেই প্রস্তাবের পক্ষে ছিলাম এবং এখনো আছি। আজকের আলোচনায় কমিশন জানিয়েছে যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দল এই পিআর পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দল ও মহল উচ্চকক্ষের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে গিয়ে একে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে। উচ্চকক্ষ যদি নিম্নকক্ষের প্রতিরূপ হয়, তাহলে তার কার্যকারিতা থাকবে না। পিআর ছাড়া উচ্চকক্ষে কোনো প্রকৃত চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স সম্ভব নয়।

সংরক্ষিত নারী আসন ১০০তে উন্নীত করার পক্ষে জামায়াতের অবস্থান জানিয়ে তাহের বলেন, ‘কমিশনের প্রস্তাবনার সাথে আমরাও একমত, সংসদে ১০০টি নারী আসন নিশ্চিত করতে হবে। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্বাচন নয়, বরং পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের কথা বলেছি। কারণ একজন নারীকে যদি তিনটি আসনের সমন্বয়ে একটি কনস্টিটুয়েন্সি দিয়ে সরাসরি ভোটে দাঁড় করানো হয়, তাহলে তা আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।’ তিনি বলেন, আমাদের নারীরা এখনো ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মেনে চলেন। এমন বাস্তবতায় পিআর পদ্ধতিতেই ১০০ নারী প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন প্রস্তাব জামায়াতের : তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও জামায়াত গতকাল কমিশনে নতুন একটি প্রস্তাব পেশ করেছে। তাহের জানান, ‘আমরা তিনটি প্রস্তাব দিয়েছি। একটি হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব। এই কমিটি সরকার ও বিরোধী দল থেকে পাঁচজন করে এবং অন্যান্য দল যাদের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে তাদের থেকে দুইজন করে প্রার্থী আহ্বান করবে। সেই প্রার্থীদের মধ্য থেকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাছাই কমিটির মধ্যে চিফ জাস্টিস একজন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তি, তিনি বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রীর পদের দায়িত্বশীলতা, বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক ভারসাম্য, এই তিনজনের সমন্বয়ে একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত আশা করা যায়।’

আলোচনার শেষাংশে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা আশা করি কমিশন মতামতের প্রতিফলন ঘটাবে এবং পিআর পদ্ধতির পক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। কারণ এখন পর্যন্ত দুই-তৃতীয়াংশের বেশি রাজনৈতিক দল এই পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছে।

তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৬৪ প্রশাসনিক জেলা ও ১২ সিটি করপোরশনের সমন্বয়ে জনগণের সরাসরি ভোটে উচ্চকক্ষ গঠনের যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে একে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে উল্লেখ করেন ডা: তাহের।

কিছু দল উচ্চকক্ষের ধারণাকে দুর্বল করার অপচেষ্টা করছে- এনসিপি : কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে উচ্চকক্ষের ধারণাকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, আমরা একমত, তবে প্রস্তাবগুলো নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, কার্যকর উচ্চকক্ষ থাকতে হবে এবং সেটি হতে হবে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। আখতার হোসেন বলেন, এনসিপির পক্ষ থেকে সংসদে সরাসরি নির্বাচিত ১০০ নারী সদস্যের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যদিও প্রক্রিয়াগতভাবে তা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, এ নিয়ে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি, তবে মিশ্র পদ্ধতির (এফপিটিপি ও টপ-আপ) মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই, দলগুলো যেন তাদের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ১৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে বাধ্য থাকে। সেই সাথে টপ-আপ পদ্ধতির মাধ্যমে বাকি নারী আসনগুলো পূরণ করে সংসদে ১০০ নারী সদস্যের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।

সংসদের উচ্চকক্ষ নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে মত দিয়েছে। তবে কিভাবে এটি গঠিত হবে, সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে। আখতার হোসেন জানান, উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণে পিআর (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতির পক্ষেই এনসিপির অবস্থান। জেলা ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক আসন বিভাজনের প্রস্তাবকে দলটি কার্যকর মনে করেনি। তিনি বলেন, আমরা বলেছি, সংবিধান সংশোধনের জন্য উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা থাকা উচিত। আখতার হোসেন আরো জানান, এনসিসি (জাতীয় নিয়োগ কমিটি) গঠনের ক্ষেত্রেও উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন বলে দলের পক্ষ থেকে মত দেয়া হয়েছে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ১৩তম বৈঠকে কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো: এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো: আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।