- একাই বাগিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ৩ পদ
- একে একে বিদায় করা হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের পক্ষের কর্মকর্তাদের
এক মনোয়ার হোসেনেই তটস্থ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। একাই যেন একশ! বাগিয়ে নিয়েছেন প্রশাসকের পিএসসহ তিনটি পদ। অভিযোগ উঠেছে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে একাট্টা হয়ে তারই প্ররোচনায় একে একে ডিএসসিসি থেকে বিদায় করে দেয়া হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের পক্ষে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরে তিনি এখনো কোন বাধা ছাড়াই চাকরি করে যাচ্ছেন।
ডিএসসিসি সূত্র বলেছে মনোয়ারের বিরুদ্ধে একাধিক জায়গায় দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকেই ডিএসসিসির দুর্নীতি দেখার জন্য খোদ অডিট বিভাগ ও আইন বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছে। এ দিকে মনোয়ার হোসেন বলেছেন, তাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তার সবকিছুই মীমাংসিত। নতুন করে কোনো অভিযোগ নেই। তিনি মাত্র দেড় মাস হয় ডিএসসিসিতে যোগ দিয়েছেন। এ যাবৎ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। কেউ হয়তো ভুলভাবে তাকে উপস্থাপন করছে।
তিনি কখনো জনপ্রতিনিধিকে থাপ্পড় মেরে প্রত্যাহার হয়েছেন, আবার কখনো অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে। তার প্রতিটি কর্মস্থলে শাস্তিমূলক প্রত্যাহার বা বদলিতে আনন্দ মিছিল করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ। বর্তমানে মনোয়ার হোসেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিরীক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সংস্থাটির প্রশাসকের একান্ত সচিব (পিএস) ও আইন কর্মকর্তার পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। গত ২ এপ্রিল মনোয়ার হোসেনকে নরসিংদী থেকে ডিএসসিসির নিরীক্ষা কর্মকর্তা পদে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বদলি হয়ে মনোয়ার হোসেনকে নিজ দায়িত্বসহ প্রশাসকের একান্ত সচিব পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দফতর আদেশ জারি করে ডিএসসিসি। পরে ১৪ মে মনোয়ার হোসেনকে ফের নিজ দায়িত্বসহ আইন কর্মকর্তা পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দফতর আদেশ জারি করেন ডিএসসিসির সচিব দফতর। একই দফতর আদেশে প্রশাসকের সাবেক একান্ত সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল রহমানকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
যদিও ডিএসসিসির নিরীক্ষা বিভাগের নিরীক্ষা কর্মকর্তা পদে বিসিএস (অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) ক্যাডার বাধ্যকতা রয়েছে। এ কারণে গত ১৭ নভেম্বর বিসিএস অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারের লোক চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম।
অভিযোগ উঠেছে, ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালামের একান্ত সচিব (পিএস) পদে দায়িত্ব পেয়ে আবার আগের কর্মস্থলের মতো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মনোয়ার হোসেন। করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। এখন সব সময় প্রশাসক আবদুস সালামকে তোষামোদ করেন। ফলে করপোরেশনের অন্য ঊর্ধŸতন কর্মকর্তারা প্রশাসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান না। এতে করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ডিএসসিসির ওই তিনটি পদ বাগিয়ে নেয়ার পর নগর ভবনে মনোয়ার হোসেনের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এখন নগর ভবনে এককভাবে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছেন তিনি। করপোরেশনের যেকোনো দরপত্রে পছন্দের লোক নিয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি জড়িয়ে পড়ছেন। সংস্থাটির কেউ তার কাজে আপত্তি বা বাধা দিলে তাকে বদলি-চাকরিচ্যুতসহ নানাভাবে হয়রানি শুরু করেছেন। তার সবশেষ বদলি হয়েছেন করপোরেশনের এক নির্বাহী প্রকৌশলী। ওই কর্মকর্তাকে সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া করপোরেশনের বিভিন্ন বিভাগে বদলিতে প্রভাব বিস্তার করছেন। অথচ মনোয়ার হোসেনের চাকরি জীবন শুরু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে। এ কারণে তখন নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির ঊর্ধŸতন এক কর্মকর্তা বলেন, মনোয়ার হোসেন করপোরেশনে প্রশাসকের পিএস দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে একক কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করছেন। যাকে বাধা মনে হয় বা হবে, তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন। ফ্যাসিস্ট আমলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক সিন্ডিকেট।
মনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
২০১৭ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে চাকরি শুরু করেন মনোয়ার হোসেন। এরপর সরকারের বিভিন্ন দফতরে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর ও কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি), বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার, চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন তিনি।
২০২২ সালে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার থাকাকালীন ওই উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে থাপ্পড় মেরে প্রত্যাহার হয়েছিলেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলার তদন্তে এ ঘটনার সত্যতাও মেলে। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে কোনো শাস্তি ভোগ করতে হয়নি। তার শাস্তি না হওয়ার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দীন চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিলো, ‘নবীন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করে অঙ্গীকার করেন, ভবিষ্যতে নিজের আচরণ সংযত রেখে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সাথে তিনি বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানান।’ প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, ‘নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাকে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো।’
২০২৩ সালের জুনে চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে ছিলেন মনোয়ার হোসেন। তখন তার বিরুদ্ধে সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর বরাবর অভিযোগ করেছিলেন জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ওসমান গনি পাটওয়ারী। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, মনোয়ার হোসেন জেলা পরিষদে যোগদানের পর পরিষদকে অকার্যকর ও সদস্যদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টির কাজে লিপ্ত। ওই কর্মকর্তা পদে থাকলে পরিষদে ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হবে। তাই তাকে অন্যত্র বদলি করার অনুরোধ করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুনে মনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জেলা পরিষদ শাখায় অভিযোগ দেন চাঁদপুরের বোরহান উদ্দিন বাহার নামে এক ব্যক্তি। ওই অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের তদন্তের নির্দেশ দেন উপসচিব মাহবুবা আইরিন। চাঁদপুর জেলা দুদকের কর্মকর্তারা ওই অভিযোগ তদন্ত করছেন।
২০২৫ সালের মে মাসে নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে যোগদান করেন মনোয়ার হোসেন। এ পদে তিনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মাত্র তিন মাস ২৯ দিন) দায়িত্বে ছিলেন। তখন ১৫ অক্টোবর মনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শত কোটি টাকার মালিক ও সম্পত্তি অর্জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর পৃথক আবেদন করেন চাঁদপুরের বোরহান উদ্দিন বাহার।
ওই অভিযোগে বলা হয়, মনোয়ার হোসেন সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম, খাস জমি বন্দোবস্ত ও অন্যান্য কার্যক্রমে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ ও প্রধান সহকারী মো: মুজিবুর রহমানের সহযোগিতায় বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রকাশনা, ক্রীড়াসামগ্রী ক্রয়, আপ্যায়ন এবং ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট কেনাসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে। জেলা পরিষদের জায়গায় অনুমোদন ছাড়াই দোকান নির্মাণের সুযোগ দেয়ার নামে কয়েকজনের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগও করা হয়েছে।
ওই অভিযোগে আরো বলা হয়, ২০২৪ সালের জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ভুয়া বিলের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা পরিষদের নথিপত্র ও বিল-ভাউচার যাচাই করলেই উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। ওই টাকা দিয়ে রাজধানীর পরিবাগে একটি বহুতল বাড়ি, ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা ও পূর্বাচলে প্লট, বিলাসবহুল গাড়ি, সঞ্চয়পত্র এবং স্ত্রীর নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান,পঞ্চগড়ে একটি বাংলো নির্মাণ করেন। এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে অবৈধ সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। তিনি দুদকের কাছে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।



