এই শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে প্রশ্ন শহীদ জিল্লুরের মায়ের

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
এই শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে প্রশ্ন শহীদ জিল্লুরের মায়ের
এই শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে প্রশ্ন শহীদ জিল্লুরের মায়ের

‘মা, নামাজ পড়ে আসি’-২০২৪ সালের ১৮ জুলাই দুপুরে মায়ের সাথে এটিই ছিল ১৭ বছর বয়সী জিল্লুর শেখের শেষ কথা। জোহরের নামাজ আদায় করে সে বন্ধুদের সাথে জুলাই আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেয়। কিছুক্ষণ পর রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয় সে। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তার পরিবার। তাদের ভাষায়, এই শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়; তবে নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচারই হতে পারে শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়বদ্ধতার প্রকাশ।

বাবা শেখ হাসান ও মা শাহনাজ বেগমের চার সন্তানের মধ্যে জিল্লুর ছিল সবার বড়। সন্তানের উন্নত শিক্ষার জন্য পরিবার গোপালগঞ্জের গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করে। ২০২৪ সালে বনশ্রীর ফয়জুর রহমান আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করে। পরে আফতাবনগরের ইম্পেরিয়াল কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার পথচলা শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায় তার জীবন। পরিবারের ইচ্ছা ছিল জিল্লুরকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলার। আর তার নিজের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথাও প্রায়ই বলত পরিবারের সদস্যদের।

জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের পরিস্থিতি তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মা শাহনাজ বেগম জানান, আন্দোলনে প্রথম নিহতদের একজন আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই ছেলে খুব অস্থির হয়ে পড়েছিল। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে সে নিয়মিত আলোচনা করত এবং উদ্বেগ প্রকাশ করত। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন শাহনাজ বেগম। তিনি বলেন, আমি বুঝতেই পারিনি, আমার ছেলে এত বড় হয়ে গেছে। আমি তো সব সময় ওকে ছোটই ভাবতাম। দেশের জন্য আন্দোলনে যাওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিয়ে ফেলেছে, সেটাও আমি বুঝতে পারিনি।

১৮ জুলাই : শহীদ হওয়ার দিন

১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরা-বাড্ডা-ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এলাকা ছিল আন্দোলনের অন্যতম উত্তপ্ত কেন্দ্র। সেদিন দুপুরে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় জিল্লুর মাকে বলেছিল, ‘আম্মু, নামাজ পড়ে আসি।’ মা তাকে দ্রুত ফিরে আসতে বললেও নামাজ শেষে সে বন্ধুদের সাথে আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে এলোপাতাড়ি রাবার বুলেট, টিয়ার শেল, ছররা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। বন্ধুকে বাঁচাতে জিল্লুর এগিয়ে গেলে কয়েকটি গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। একটি গুলি তার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। এরপর সহপাঠীরা তাকে দ্রুত আদাবর নাগরিক হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করলেও পথেই আনুমানিক বেলা ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার খবর প্রথমে এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারে পরিবার। শাহনাজ বেগম জানান, তখন তিনি পাশের বাসায় টেলিভিশনে চলমান পরিস্থিতির সংবাদ দেখছিলেন। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়ে দেখেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই।

পরে রাজধানীর বাড্ডায় প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১৯ জুলাই গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠি সপ্তপল্লী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মায়ের ভাষ্য, জিল্লুর ছিল অত্যন্ত দায়িত্বশীল। এসএসসি পড়াকালেও নিজের হাতখরচের টাকা নিজের জন্য ব্যয় না করে ছোট ভাইবোনের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনত। পরিবারের সবার খোঁজখবর রাখত এবং দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখত। তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে সংসার চললেও বড় ছেলেকে ছাড়া প্রতিটি দিন তাদের কাছে কষ্টের।

বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

জিল্লুর শেখের পরিবার বলছে, সন্তানের মৃত্যু কোনো বিচারের মাধ্যমেই পূরণ হওয়ার নয়। তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে অন্তত তারা কিছুটা মানসিক শান্তি পাবেন। শাহনাজ বেগম বলেন, বিচার চেয়েও কোনো লাভ দেখি না। জুলাইয়ের পরে দেশে এত শিশু-কিশোর ও মানুষের মৃত্যুরও বিচার হয়নি। তিনি বলেন, আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি দেশের জন্য রাজপথে গিয়েছিল। তবে যদি সত্যিকার বিচার হয়, তাহলে শুধু আমরা নয়, পুরো দেশের মানুষই স্বস্তি পাবে।

পরিবারের প্রত্যাশা, জুলাই আন্দোলনে নিহত নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়। তাদের বিশ্বাস, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হবে নিহতদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান।