শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখাতে চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • শিক্ষক নেই, অবকাঠামো অপ্রতুলতায় বাড়বে বৈষম্যের ঝুঁকি
  • চীনের ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে : শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় আরো একটি বিদেশী ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের তরুণদের এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যেই এ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আরবি, চীনা, জাপানি, কোরিয়ান, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষাকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন উঠেছে যে শিক্ষাব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো বাংলা ও ইংরেজিতেই কাক্সিক্ষত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, সেখানে তৃতীয় ভাষা শেখানোর প্রস্তুতি কতটা বাস্তবসম্মত? যদিও শিক্ষামন্ত্রী নিজেই চীনা ভাষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের শিল্প বাণিজ্যের গুরুত্বের বিবেচনায় চীনের ভাষাকে টার্গেট নিয়ে বেশকিছু পদক্ষেপও ইতোমধ্যে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল রোববার তিনি জানিয়েছেন ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিনিধি দলের চীন সফর শেষে শিক্ষার্থীদের কারিগরি দক্ষতায় বিশেষ সম্ভাবনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ জন্য ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ করবে সরকার। ভিসা জটিলতা দূর করতে মন্ত্রিপরিষদে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ দিকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরিপে যে তথ্য উঠে এসেছে সেখানে দেখা গেছে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ভাষাদক্ষতার চিত্র উদ্বেগজনক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২ অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণীর ৫১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণীর ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী কাক্সিক্ষত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ইংরেজিতেও ঘাটতি ব্যাপক। এমন বাস্তবতায় নতুন একটি ভাষা যুক্ত হলে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত শিক্ষাভার তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপর দিকে ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তৃতীয় ভাষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের বৃহত্তর শিক্ষানীতিতে জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার সাথে ভাষাদক্ষতাকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আবার ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে তৃতীয় ভাষা জানা শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ঋণ সুবিধার প্রস্তাবের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তৃতীয় ভাষাকে এখন কেবল অতিরিক্ত একটি বিষয় হিসেবে নয়, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকারের চমকপ্রদ পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তৃতীয় ভাষা শেখানোর অন্যতম প্রধান সমস্যা হবে দক্ষ শিক্ষক পাওয়া। একটি বিদেশী ভাষা শুধু বই পড়িয়ে শেখানো সম্ভব নয়; শুনতে, বলতে, লিখতে ও বাস্তব পরিস্থিতিতে যোগাযোগ করতে হয়। আর একাধিক জরিপে শিক্ষকদের এই ভাষা শেখানোর সক্ষমতা ও চর্চার ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। সুতরাং নতুন ভাষা চালুর ক্ষেত্রে তাই শুধু বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে যুক্ত করলেই হবে না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ভাষাগার, অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধা এবং নিয়মিত কথোপকথনের পরিবেশ। সরকারের এই পরিকল্পনায় তৃতীয় ভাষা শিক্ষার আরেকটি বড় ঝুঁকি সামাজিক বৈষম্য। বর্তমানে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে বিভিন্ন ভাষা শেখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগ সীমিত। সূত্রমতে ভাষা শিক্ষাকে কেন্দ্র করে বেসরকারি প্রশিক্ষণব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে এবং আর্থিক সামর্থ্যরে কারণে শিক্ষার্থীদের সুযোগের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

আবার তৃতীয় ভাষার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা তৈরি হলে সুবিধা পাবে শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য বইনির্ভর ভাষা শিখবে। এতে সরকারের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সমান সুযোগ তৈরি করার পরিবর্তে উল্টো বৈষম্যও বাড়াতে পারে। যদিও এই সঙ্কট মোকাবেলায় উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অবশ্য কিছু অগ্রগতি হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৩০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি ১৩টি ভাষা শেখানো হয়।

প্রাথমিকভাবে আরবি, জাপানি, কোরিয়ান, চীনা ও ইতালীয় ভাষাকে অগ্রাধিকার দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ভাষা কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক ল্যাব, প্রযুক্তি এবং জনবল কাঠামো তৈরির কথাও বলা হয়েছে। একই সাথে এগুলো যেন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও নজরদারির কথা জানিয়েছে ইউজিসি। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেছেন, দেশে চীনা ভাষা শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নেই। চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে প্রশিক্ষকদের চীনে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্য যদি কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষা হয়, তাহলে সব শিক্ষার্থীকে একই ভাষা শেখানোর বদলে অঞ্চল ও ভবিষ্যৎ পেশার ভিত্তিতে ভাষা নির্বাচনের সুযোগ দেয়া জরুরি। যেমন জাপানে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীর জন্য জাপানি, চীনকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ম্যান্ডারিন এবং ইউরোপমুখী শিক্ষার্থীদের জন্য ফরাসি বা জার্মান কার্যকর হতে পারে। তবে বাংলাদেশে তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ কোনোক্রমেই বাতিল করার মতো নয়; বরং এটি সময়োপযোগী। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সম্প্রতি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে বলেছেন, শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, সাফল্যের মূল চাবিকাঠি কার্যকর বাস্তবায়ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমে বাংলা ও ইংরেজির মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তৃতীয় ভাষা চালু করে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, ভাষা ল্যাব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যন্ত ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বা কম খরচে শেখার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ তৃতীয় ভাষা শেখানোর লক্ষ্য যদি শুধু নতুন একটি বিষয় পাঠ্যবইয়ে যোগ করা হয়, তাহলে তা আরেকটি মুখস্থনির্ভর বিষয়ে পরিণত হবে। আর যদি লক্ষ্য হয় বৈশ্বিক নাগরিক তৈরি, তাহলে ভাষাকে পরীক্ষার বিষয় শুধু নয় বরং যোগাযোগ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের হাতিয়ার হিসেবে শেখাতে হবে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষার উদ্যোগকে শুধু নতুন একটি বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি হতে পারে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় হাতিয়ার। কিন্তু বাংলা ও ইংরেজির মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত না করে, প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি না করে এবং জেলাভিত্তিক অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর না করে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করা হলে তা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে নতুন যেকোনো কাজেই প্রথমে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিতে হবে। তাই প্রথম ধাপে প্রতিটি জেলার ভাষাভিত্তিক চাহিদা নির্ধারণ, শিক্ষকসংখ্যার ঘাটতি চিহ্নিতকরণ, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা এবং ভাষা ল্যাব স্থাপন করা প্রয়োজন। এরপর কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে ফলাফল মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। কারণ ভাষা শেখানো মানে শুধু একটি নতুন বর্ণমালা বা শব্দভাণ্ডার শেখানো নয়; ভাষা মানে যোগাযোগের সক্ষমতা, সংস্কৃতি বোঝার ক্ষমতা এবং বিশ্ব শ্রমবাজারে প্রবেশের দরজা। সেই দরজা সবার জন্য খুলতে হলে তৃতীয় ভাষার আগে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার মৌলিক ভিত্তিটা সবার জন্য সমান।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের নেতৃত্বে সম্প্রতি আমাদের একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করেছেন। আমরা শিক্ষা খাতে চীনের সাথে কয়েক সমঝোতা স্মারক সই করেছি। তৃতীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আমরা শিক্ষা খাতে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। তাদের ইন্ড্রাস্টি ও একাডেমিয়ার সাথে সম্পর্ক খুব শক্তিশালী। তাদের শিক্ষার সাথে ইন্ড্রাস্টির যে সহযোগিতা যে মডেল রয়েছে, সেটি আমরা অনুসরণ করতে চাই।