নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত চায়না-বাংলাদেশ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের (স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার) আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। বাংলাদেশ-চীনের ‘সামুদ্রিক সিল্ক রোডে’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এই স্টেশন বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণা, মৎস্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ পূর্বাভাস এবং নীল অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
প্রকল্পের সমন্বয়ক ও ডাটা সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না নয়া দিগন্তকে বলেন, বঙ্গোপসাগর নিয়ে উচ্চমানের গবেষণা করতে গেলে আমাদের নিজস্ব রিয়েল-টাইম ডাটা ও নমুনা সংগ্রহ করা আবশ্যক। আমাদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে সমুদ্র থেকে সরাসরি ডাটা বা নমুনা সংগ্রহের জন্য জাতীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোন সক্ষমতা গড়ে উঠেনি। এ ক্ষেত্রে আমাদের একমাত্র ভরসা স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য উপাত্ত। কিন্তু বিদেশী স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ডাটা পেতে বিলম্ব হয়, রেজোলিউশন কম হয়, অনেক তথ্য উন্মুক্ত থাকে না এবং কাক্সিক্ষত পরিমাণ ও লেবেলের ডাটা পাওয়া যায় না। এ উপলব্ধি থেকেই ২০১৯ সালে চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির কাছে চবি ওশানোগ্রাফি বিভাগের পক্ষ থেকে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনার প্রস্তাবনা দেয়া হয়।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না বলেন, এটি একটি এক্স অ্যান্ড এল ব্যান্ড স্যাটেলাইট ডাটা রিসেপশন সিস্টেম, যা বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে উড়ন্ত বিভিন্ন ওশান ও আবহাওয়া (আর্থ অব্জারভেশন) স্যাটেলাইট থেকে ডাটা সংগ্রহ করতে সক্ষম। প্রাপ্ত স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে-৭টি চীনা স্যাটেলাইট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি, ইউরোপের (ইইউম্যাটস্যাট/ইএসএ) মেটপ-বি এবং জাপানের হিমাওয়ারি৯।
কেন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ : তিনি বলেন, এ স্টেশনের মাল্টিডাইমেনশনাল ব্যবহার সম্ভাবনা থাকলেও আমাদের কাছে দুইটি পারস্পেক্টিভ অগ্রাধিকার পেয়েছে- প্রথমত, স্যাটেলাইট ও রিমোটসেন্সিং ভিত্তিক সমুদ্রশিক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করা যাতে করে আমাদের গবেষক ও শিক্ষার্থীরা একেবারে জিরো লেভেল থেকে উচ্চ লেভেলে ডাটা হ্যান্ডলিং, সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার কাস্টমাইজ করা, আল্গারিদম ডেভেলপ করা, ইকুইশন মডিফাই কিংবা উন্নত করা এবং সাথে সাথে এআই, মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্কিং ব্যবহার করে বিগ ডাটা আনালাইসিস ক্যাপাসিটি তৈরির মাধ্যমে স্কিল ম্যানপাওয়ার তৈরি।
দ্বিতীয়ত, এসব গবেষণা লব্ধ ফলাফল ব্যবহার করে যে আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। তার মধ্যে অন্যতম- মৎস্য ও খাদ্য নিরাপত্তা : বঙ্গোপসাগর থেকে আমরা বার্ষিক প্রায় ৬-৭ লাখ টন মাছ আহরণ করি। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ ধরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাছের উৎপাদনশীলতা কমছে। এই স্টেশনের মাধ্যমে আমরা ক্লোরোফিলের ঘনত্ব (শৈবালের পরিমাণ) ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার রিয়েল-টাইম মানচিত্র তৈরি করার গবেষণা পরিচালনা করব। এতে মাছের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ সহজ হবে, যা মৎস্যজীবীদের আয় বাড়াবে এবং টেকসই মাছ ধরায় সহায়তা করবে।
দুর্যোগ পূর্বাভাস ও জলবায়ু অভিযোজন : গত ৫০ বছরে ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, স্রোতের গতিপথ এবং বায়ুর চাপের স্যাটেলাইট ডাটা পেলে আমরা ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও আঘাত হানার স্থান আরো নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দিতে পারব। এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নীল অর্থনীতি বাস্তবায়ন : সামুদ্রিক খনিজ জরিপ, অফশোর গ্যাসক্ষেত্র নিরীক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক পর্যটন-এই সব ক্ষেত্রেই সঠিক ও আপডেটেড ডাটা ছাড়া পরিকল্পনা সম্ভব নয়। আমাদের স্টেশন সেই ডাটা সরবরাহ করবে।
চীনের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার কারণ : এই স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে চীনের অশীদারত্ব প্রসঙ্গে প্রথমত- বৈজ্ঞানিক কূটনীতি ও নীল অর্থনীতি : চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় ‘নীল অর্থনীতি’ ও সমুদ্র বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ চীনের ‘সামুদ্রিক সিল্ক রোডে’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দ্বিতীয়ত- জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময় : চীন শুধু সরঞ্জাম দিয়েই থেমে থাকেনি; তারা আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেবে। আমরা প্রত্যাশা করছি দুই/তিন ধাপে অন্তত ২০ জন বাংলাদেশী গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ চীনে উন্নত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করবে।
তৃতীয়ত-যৌথ গবেষণা ও মডেলিং : চীনা গবেষকরা বঙ্গোপসাগরের জলবায়ু মডেলিং ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র গবেষণায় বাংলাদেশের তথ্য ব্যবহার করতে আগ্রহী। বিনিময়ে তারা আমাদের সফটওয়্যার ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত ব্যবস্থা : দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে সবার আগে দেশ ও মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়া আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এই অংশীদারিত্ব সম্পূর্ণ সিভিল ও গবেষণাভিত্তিক। তাই এর সাথে কোনো সামরিক বা গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতা না থাকায় অথবা এ সেন্টার থেকে কোনো আপলিংক পদ্ধতিতে ডাটা ট্রান্সফার ফেসিলিটিজ না থাকায় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো ঝুঁকি নাই।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা : ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে এই সমুদ্র বিজ্ঞানী বলেন- আমাদের পরিকল্পনা শুধু এখানে থেমে থাকবে না। আগামী দিনগুলোতে আমরা নানা পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো-
সমুদ্রে বয়া স্থাপন : স্যাটেলাইটভিত্তিক রিমোট সেন্সিং রিসিভিং স্টেশন থেকে প্রাপ্ত ডাটার মান নিশ্চিত করতে আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরের সহায়তায় সমুদ্রে দরকারি সেন্সরসহ একটা বয়া স্থাপন করব।
ওপেন ডাটা পোর্টাল : গবেষকদের জন্য একটি ওপেন-অ্যাক্সেস ডাটা পোর্টাল চালু করা হবে, যেখানে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা নামমাত্র ফি বা প্রাতিষ্ঠানিক সদস্যপদ ব্যবস্থার মাধ্যমে ডাটা ব্যবহার করতে পারবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে যথাযথ রেফারেন্স দিয়ে।
এআইভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সমুদ্রের পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা হবে। এটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা আছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ব্যবহার করা যাবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক : আমরা সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যেমন স্পারসো, বিএমডি, বিএসসিএল, আইডব্লিউএম, সিইজিআইএস, বন্দর, বিসিসিটির সাথে এমওইউ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মহাসাগর পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কের (যেমন জিওওএস, আইওএস) সাথে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।
প্রসঙ্গত, প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষে ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিক এমওইউ স্বাক্ষরিত হয় এসআইও ও চবির মধ্যে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে সরাসরি যোগাযোগ অসম্ভব হয়ে পড়ে প্রায় ২ বছর। এসআইওর আমন্ত্রণে চবির তৎকালীন প্রোভিসিসহ চবির প্রতিনিধিদল কুনমিং ও হাংযুতে এসআইওর গবেষণা ফ্যাসিলিটিজ পরিদর্শনে যান ও চাইনিজ টিমকে চবিতে ভিজিটের আমন্ত্রণ জানান। ২০২৪ এর জুলাইতে চাইনিজ টিম বাংলাদেশে আসেন, একটি সেমিনারে টেকনিক্যাল ও এক্সপার্ট সাপোর্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্রেনিং ওয়ার্কশপ আয়োজন করে যেখানে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ২৪টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। সে সফরের সময় চবির সাথে যৌথ আয়োজনে একটি ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং বর্তমানে নির্মিত স্থান নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ এর ডিসেম্বরে চবির তৎকালীন ভিসি, প্রোভিসি (প্রশাসন) ও প্রকল্প সমন্বয়ক এসআইও ভিজিট করতে যান এবং স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং নির্মাণের ও দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারিত্বের অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। যেখানে এসআইও সব টেকনিক্যাল ও ইনস্ট্রুমেন্টাল সাপোর্ট এবং চবি সব ইনকাইন্ড সাপোর্ট দেবে বলে একমত হয়ে সমযোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০২৫ এর ২৬ শে মার্চ অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে এরই মধ্যে শেষ হয় এবং বর্তমানে বেশির ভাগ সফটওয়্যার ও এল্গারিদম উন্নয়নের কাজ শেষ করে ডাটা সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।



