বিদেশী বিনিয়োগ : প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের খবর এলেই প্রায়ই শিরোনাম হয় ‘হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ’, ‘বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব’, কিংবা ‘বড় বিনিয়োগের ঘোষণা’। কিন্তু বাস্তব এই বিনিয়োগ কতখানি প্রকৃত বিনিয়োগ তা নিয়ে প্রশ্নই থেকেই যায়।

ঘোষিত বিনিয়োগ, প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ, পাইপলাইনে থাকা প্রকল্প এবং বাস্তবে দেশে প্রবেশ করা বৈদেশিক মূলধন- চারটি এক জিনিস নয়। সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘোষণার অঙ্ক যত বড়ই হোক, বাস্তবে বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থে প্রকৃত বিনিয়োগ তার তুলনায় অনেক কম।

২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ঘোষণা : ৯.২১ বিলিয়ন ডলার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুন মাসে চীন সফরে যান। এ সময় বাংলাদেশে ১২টি চীনা কোম্পানি মোট ৯.২১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ আনুমানিক এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, উৎপাদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতে এসব প্রস্তাব দেয়া হয়।

কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ৯.২১ বিলিয়ন ডলার (৯২১ কোটি ডলার) প্রকৃত অর্থে কোনো বিনিয়োগ নয়; এটি কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ইওউঅ) নির্বাহী চেয়ারম্যান নিজেই বলেছেন, এসব প্রস্তাব তখনো সরকারের যাচাই করা হয়নি এবং এগুলো বাস্তবায়িত হবে কি না, সে নিশ্চয়তাও দেয়া যায় না।

অর্থাৎ সংবাদে যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অঙ্ক দেখা যাচ্ছে, সেটিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে প্রবেশ করা বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে গণনা করা যাবে না।

২০২৫ সালের বিনিয়োগ সম্মেলনে ছিল বড় ঘোষণা

গত অন্তবর্তী সরকারের ২০২৫ সালে এপ্রিলে বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রাথমিকভাবে তিন হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া যায়। প্রায় ৪১৫ বিদেশী ও প্রবাসী বাংলাদেশী প্রতিনিধি এ সম্মেলনে যোগদান করেন। কিন্তু সম্মেলনের সময় বিডা স্পষ্ট করেছিল যে লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিশ্রুতি নয়; দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পাইপলাইন তৈরি করাও ছিল উদ্দেশ্য। এমনকি বিডা কর্মকর্তারা আগের সম্মেলনে এর বড় বড় বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন।

ফলে তিন হাজার ১০০ কোটি টাকাকেও সরাসরি ‘বাংলাদেশে আসা বিনিয়োগ’ বলা ঠিক হবে না।

২০১৬ সালে চীনের বিশাল বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি

২০১৬ সালে চীনের পক্ষ থেকে আসে বিশাল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। ওই বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। একই সময় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এ যুক্ত হয়। পরবর্তী দেখা যায় এই বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি অর্ধেকও বাস্তবায়িত হয়নি।

তাহলে বাস্তবে কত বিনিয়োগ এসেছে?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানটি পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট এফডিআই (সরাসরি প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ) এসেছে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার, (১৭৭ কোটি ডলার) যা ২০২৪ সালের ১.২৭ বিলিয়ন ডলারের (১২৭ কোটি ডলার) তুলনায় ৩৯.৩৬ শতাংশ বেশি।

১ ডলার আনুমানিক ১২২ টাকা ধরে হিসাব করলে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার প্রায় ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৬ সালে চীনা কোম্পানিগুলোর ঘোষিত এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ২০২৫ সালের পুরো বছরের নিট এফডিআই ছিল তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশেরও কম। কিন্তু সেই সালে মোট যে এফডিআই এসেছিল তা আফ্রিকার ঘানা ও উগান্ডার চেয়ে কম। অন্ততপক্ষে জাতিসঙ্ঘের আঙ্কটাড প্রতিবেদনে সে তথ্যই প্রকাশ করা হয়েছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। অর্থাৎ ১.৭৭ বিলিয়ন ডলারের সবটাই নতুন বিদেশী কোম্পানি এসে বাংলাদেশে নতুন কারখানা বা ব্যবসা স্থাপনের মূলধন নয়। ইক্যুয়িটি ক্যাপিটাল বা সম-মূলধন ছিল মাত্র ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের মতো, অর্থাৎ প্রায় ছয় হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বাকি বড় অংশ এসেছে বাংলাদেশে আগে থেকেই থাকা বিদেশী কোম্পানির মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে।

এটাই ‘ঘোষিত বিনিয়োগ’ ও ‘নতুন বিনিয়োগ’-এর পার্থক্য বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

নতুন বিনিয়োগের পাইপলাইন কতটা বাস্তব হচ্ছে?

এখানে অবশ্য কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও আছে। বিডা ২০২৫ সালে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি করেছিল, যেখানে ২০টি দেশের ৭০ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ছিল। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে গেছে। অর্থাৎ পাইপলাইনের ১৫ শতাংশের বেশি এখন কার্যকর পর্যায়ের দিকে এগিয়েছে।

এখানে অবশ্য ‘বাস্তবায়ন পর্যায়ে’ যাওয়াকেও পুরো টাকা দেশে ঢুকে গেছে বলা যাবে না। তবে এটি নিছক ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব অগ্রগতি।

বাংলাদেশে এফডিআই কেন এখনো এত কম?

বাংলাদেশে এফডিআইয়ের পরিমাণ অর্থনীতির আকারের তুলনায় এখনো কম। বিডার এর হিসাবে, বাংলাদেশে এফডিআই দেশের মোট জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৫ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৪ শতাংশ।

২০২৫ সালে নিট এফডিআই বাড়লেও এর বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। নতুন গ্রিন ফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট বা একেবারে নতুন প্রকল্প স্থাপনের বৈশ্বিক প্রবণতাও দুর্বল ছিল; বিডা জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী গ্রিন ফিল্ড প্রকল্পে ঘোষণা ১৬ শতাংশ কমেছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, জমি ও অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, করনীতি এবং ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা- এসব কারণ বড় বিনিয়োগের ঘোষণাকে দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা ভয়াবহতা কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগকারীদের এখানে বিনিয়োগে নিরুসায়িত করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবীদরা।