প্রথম দুই কিস্তিতে আমরা আদানির বিদ্যুৎ ক্রয়ের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে নিজস্ব অববাহিকাভিত্তিক ‘ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড’ তৈরির তাত্ত্বিক ও কারিগরি দিক আলোচনা করেছি। তবে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকৌশল কিংবা প্রযুক্তির নয়; বরং তা হলো-বিশাল অর্থায়নের ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনীতি।
যেহেতু বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর উৎস দেশের বাইরে, তাই এই মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ কেবল অভ্যন্তরীণ সদিচ্ছার ওপর নয়; বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল।
১. ৫ থেকে ১১ লাখ কোটি টাকার খতিয়ান : এই মহাপরিকল্পনা কেন এত ব্যয়বহুল
বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই সমন্বিত নদী-শক্তি-জলবায়ু ব্যবস্থাপনা প্যাকেজটির সম্ভাব্য মোট ব্যয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন থেকে ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (আনুমানিক ৫-১১ লাখ কোটি টাকা+)। এটি একক কোনো বছরের বাজেট নয়, বরং ১৫-৩০ বছরের ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি প্রজন্মব্যাপী বিনিয়োগ কাঠামো।
খাতভিত্তিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের কাঠামো
ক্স পদ্মা ব্যারাজ ও রেগুলেটর : ৮ - ১৫ বিলিয়ন ডলার
ক্স যমুনা/ব্রহ্মপুত্র ব্যারাজ : ১০ - ২০ বিলিয়ন ডলার
ক্স তিস্তা আধুনিকায়ন ও সংযোগ : ৩ - ৮ বিলিয়ন ডলার
ক্স নদী পুনঃখনন ও আন্তঃনদী খাল নেটওয়ার্ক : ৫ - ১২ বিলিয়ন ডলার
ক্স পাম্পড স্টোরেজ ও হাইড্রো অবকাঠামো : ৪ - ১০ বিলিয়ন ডলার
ক্স বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ও তীর সংরক্ষণ : ৩ - ৮ বিলিয়ন ডলার
ক্স স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট (ডিজিটাল গ্রিড) : ১ - ৩ বিলিয়ন ডলার
ক্স ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন : ৩ - ৭ বিলিয়ন ডলার
ক্স ট্রান্সমিশন ও গ্রিড অবকাঠামো (ঐঠউঈ) : ৩ - ৬ বিলিয়ন ডলার
ক্স পরিবেশগত ভারসাম্য ও অববাহিকা পুনর্বাসন : ১ - ৩ বিলিয়ন
ব্যয়ের গভীরতম ৪টি কারণ
১. গতিশীল ও পলিবাহী নদীশাসন : পদ্মা ও যমুনার মতো অত্যন্ত প্রবহমান ও পলিবাহী নদীতে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে গভীর ফাউন্ডেশন, দীর্ঘ স্প্যান ব্যারাজ ডিজাইন এবং নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
২. বিশাল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং রূপান্তর : সারা দেশে হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃসংযোগ, রেগুলেটর এবং কৃত্রিম জলাধারের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি করার খরচ বিশাল।
৩. গ্রিড ইন্টিগ্রেশন ও স্টোরেজ : শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, সৌর-হাইড্রো হাইব্রিড সিস্টেমের জন্য সাবস্টেশন, টারবাইন এবং উন্নত এইচভিডিসি (ঐঠউঈ) ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ এই ব্যয়কে বাড়ায়।
৪. ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট ডিজাইন : সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙনের মতো জলবায়ু ঝুঁঁকি মোকাবেলা করতে পুরো সিস্টেমকে অতিরিক্ত টেকসই করে ডিজাইন করতে হয়।
একবিংশ শতাব্দীর কৌশলগত সম্পদ : পানি কি আগামী ভূরাজনীতির কেন্দ্র
একবিংশ শতাব্দীতে তেল, গ্যাস কিংবা সমুদ্রবন্দরের মতোই ‘পানি’ ক্রমশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হচ্ছে। পদ্মা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র-এই তিনটি প্রধান ধমনীই আন্তঃসীমান্ত নদী। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি কেবল ‘কত কিউসেক পানি পাওয়া যাবে’ তা নয়; বরং কে পানি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেই নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ কী?
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা : ভারত-চীন দ্বন্দ্বের মাঝে বাংলাদেশ
উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি তিস্তা নদী। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এর প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। গত তিন দশক ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানগত অমিল) এবং কূটনৈতিক জটিলতার কারণে ঝুলে আছে। এই অচলাবস্থা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক নদীর ওপর নিম্নœ অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কতটা সীমিত এবং এটি কতটা খাঁটি কূটনৈতিক প্রশ্ন।
ব্রহ্মপুত্র : দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র
আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্র নদী তিস্তার চেয়েও বড় ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া এই বিশাল জলরাশি ও পলি প্রবাহ চীন, ভারত ও বাংলাদেশ, তিনটি দেশেরই জীবনরেখা।
ক্স চীনের উজানের বাঁধ প্রকল্প : তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীনের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণ ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে বেইজিং এই নদীর প্রবাহকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশেও এই নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ক্স প্রবাহের বাস্তবতা : যদিও চীন দাবি করে এই প্রকল্পগুলো ‘রান-অফ-রিভার’ (শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, পানি সরিয়ে নেয়ার জন্য নয়,) এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন-ব্রহ্মপুত্রের বিশাল প্রবাহ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; তবুও উজানের অবকাঠামো নিম্নœ অববাহিকার দেশগুলোর কৌশলগত মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ও বাংলাদেশের উদ্বেগ
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাভিলাষী ‘আন্তঃনদী সংযোগ কর্মসূচি’র মূল লক্ষ্য উদ্বৃত্ত পানির নদী থেকে পানি ঘাটতিগ্রস্ত অঞ্চলে জল স্থানান্তর করা, যা বাংলাদেশের অববাহিকা ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি বড় চিন্তার কারণ।
ক্স এর সমর্থকদের যুক্তি হলো এটি ভারতের নিজস্ব খরা ও বন্যা মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
ক্স এতে বাংলাদেশের ঝুঁঁকি হলো-এত বড় মাত্রায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তন করা হলে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে এবং নিম্ন অববাহিকায় বাংলাদেশের নদীগুলো স্থায়ীভাবে নাব্যতা ও পানির প্রবাহ হারাবে। ভারতের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার কথা বলা হলেও, এটি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ওয়াটার-গ্রিড প্রকল্পের কার্যকারিতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
কূটনীতিই যেখানে প্রধান প্রকৌশল
পদ্মা-তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের যে মহাপরিকল্পনা, তার আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হলেও, এর চূড়ান্ত চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে হাইড্রোলজিক্যাল ডিপ্লোমেসি বা পানি-কূটনীতিতে। উজান ও নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে শক্তিশালী আঞ্চলিক সমঝোতা, অববাহিকাভিত্তিক যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ছাড়া এই মেগা-স্ট্র্যাটেজি সফল করা অসম্ভব। বাংলাদেশ যদি একটি সমন্বিত আঞ্চলিক হাইড্রো-গ্রিডের ‘ট্রান্সমিশন হাব’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবেই কেবল এই ভূরাজনৈতিক জটিলতাকে একটি অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
পরের কিস্তিতে পড়ুন : ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং ২০৫০ সালের বাংলাদেশের এনার্জি ব্লুপ্রিন্ট : বাস্তবায়নের রোডম্যাপ’



