আহমেদ ইফতেখার
বর্তমান যুগে আমাদের কাজের গতি বাড়াতে কিংবা স্মার্ট সিদ্ধান্ত নিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই’র ব্যবহার এখন একরকম বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদের পিছে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুধু যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে তা-ই নয়, বরং সম্পূর্ণ অজান্তেই তারা হারিয়ে ফেলছে তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ গোপন ও কৌশলগত ব্যবসায়িক তথ্য। এআইকে যত বেশি তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করা হচ্ছে, সেটি ততই সেই প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন, বাজার ধরার পলিসি এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত অভিজ্ঞতা রপ্ত করে নিচ্ছে। আর এভাবে পুঞ্জীভূত হওয়া জ্ঞান একসময় এআই প্রস্তুতকারক টেক জায়ান্টদের জন্য একচেটিয়া প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করে দিতে পারে।
সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সত্য নাদেলা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। প্রযুক্তি বিশ্বে করপোরেট ডেটা ও এআই সংস্কৃতির এই অন্ধকার দিকটি নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নিজের এক ব্লগ বার্তায় সত্য নাদেলা এই সঙ্কটের একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানের করপোরেট সমাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে সেরা আউটপুট পাওয়ার জন্য প্রথমবার তারা দিচ্ছে সরাসরি আর্থিক মূল্য বা সাবস্ক্রিপশন ফি। আর দ্বিতীয়বার দিচ্ছে আরও বেশি দামি ও অমূল্য কিছু, সেটি হলো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সামগ্রিক তথ্য।
নাদেলার মতে, একটি এআই মডেলকে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উপযোগী ও কার্যকরী করে তুলতে হলে সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরের নানা গোপন তথ্য না দিলেই নয়। ব্যবহারকারীরা তাদের কাজের মান যতটা নিখুঁত বা ভালো করতে চাইবেন, স্বাভাবিকভাবেই এআই মডেলকে তত বেশি গভীরে নিয়ে যেতে হবে এবং সংবেদনশীল তথ্য সেখানে ইনপুট দিতে হবে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল ফাঁদটি।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয় যখন সাধারণ ব্যবহারকারী বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এআইকে নতুন কোনো কাজের নির্দেশনা (প্রম্পট) দেন, বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যারের সাথে এটিকে যুক্ত করেন কিংবা এআই-এর কোনো ভুলত্রুটি সংশোধন করে দেন। বাহ্যিকভাবে এটিকে সাধারণ কাজ মনে হলেও প্রযুক্তিগতভাবে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত মানুষের দেয়া এই প্রম্পট এবং তার ভুল সংশোধন প্রক্রিয়া থেকেই প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করে।
একটি প্রতিষ্ঠানের বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা কর্মদক্ষতা, মানবসম্পদের বিশেষায়িত জ্ঞান এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার নির্যাস যখন এআই সংশোধনের মাধ্যমে সিস্টেমে ইনপুট দেয়া হয়, তখন তা চিরতরে সেই এআই মডেলের মেমরির অংশ হয়ে যায়। এই অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢাললেও বাজারে সহজে কিনতে পারত না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, আধুনিক যুগের বহু প্রতিষ্ঠান উন্নত প্রযুক্তির মোহে পড়ে স্বেচ্ছায় এবং অবহেলায় সেই অমূল্য সম্পদ এআই মডেল পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছে।
প্রযুক্তি বাজারে এআই-এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ফাঁসের এই বিতর্ক অবশ্য একদম নতুন নয়। সত্য নাদেলার এই সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার আগে সিলিকন ভ্যালির নামকরা প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী জেসন ক্যালাকানিস এবং প্রখ্যাত সফটওয়্যার জায়ান্ট প্যালান্টিরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্স কার্পও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন।
তাদের যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক কিংবা গুগলের মতো বড় বড় টেক জায়ান্টদের তৈরি করা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ছোট-বড় কোম্পানি তাদের ইন্টারনাল ডেটাবেজ, কাজের সূক্ষ কৌশল এবং ইউনিক বিজনেস মডেলগুলো উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। যার শেষ পরিণতি হতে পারে করপোরেট বিশ্বের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ গুটি কয়েক টেক জায়ান্টের হাতে চলে যাওয়া।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহারে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। তবে প্রতিটি সংস্থাকেই এখন থেকে তথ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে সীমারেখা টেনে দিতে হবে। এআই প্রম্পটে কী ধরনের তথ্য দেয়া হচ্ছে এবং তা কীভাবে ডেটা সেন্টারে সংরক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে নিজেদের সতর্ক হতে হবে।



