আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে জনবলসঙ্কট দেখা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বে ভূমি কার্যালয়, ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে থানার আইনি কার্যক্রম এবং একজন কর্মকর্তা দিয়ে একাধিক ইউনিয়নের ভূমি ব্যবস্থাপনার কাজ চলছে। এতে জনসেবা ও তদারকি ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমানকে গত ২৮ জুলাই ভৈরব থানায় বদলি করা হয়। পরদিন তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে থানার কার্যক্রম চলছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) শহিদুল্লাহ ইসলাম গত ৩ আগস্ট ঢাকার গুলশান সার্কেলে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে ভূমি কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন ইউএনও রেহেনা মজুমদার মুক্তি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনিও আগামী সপ্তাহে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাচ্ছেন।
এদিকে বাজিতপুর সার্কেলের দায়িত্বে থাকা তৃপ্তি মণ্ডল ছুটিতে যাওয়ার পর গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন ভৈরব ও কুলিয়ারচর সার্কেলের কর্মকর্তা আবু মুসা শেখ।
নিকলী উপজেলায় রয়েছে সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ। ২১৪ দশমিক ৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ৪৬ হাজার। ছয়টি ইউনিয়নে ভূমি কার্যালয় থাকলেও সহকারী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র একজন। সদর ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা সামসুল ইসলাম অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রতি সোমবার জারইতলা ইউনিয়নের কাজও করছেন। বাকি উপসহকারী দিয়েই চলে পুরো উপজেলার এ সেক্টরের সেবা কার্যক্রম।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হাওরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হওয়ায় নিকলীতে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা, নদী-জলাশয় রক্ষা ও সরকারি সম্পদ সংরক্ষণে প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি জরুরি। বর্ষায় নিকলীতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি নানা ধরনের অপরাধ ও অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়ে। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকা এবং কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল স্থানীয়দের জন্য একটি খাদ্যভাণ্ডার, প্রাকৃতিক সম্পদের আধার এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকার কেন্দ্র। বছরের একটি বড় সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকা এই অঞ্চলে প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই হাওরাঞ্চলে প্রশাসনিক তদারকির ধারাবাহিকতা ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতি অপরিহার্য।
সম্প্রতি নিকলীর বিভিন্ন সরকারি সেবা ও দফতরের কার্যক্রম ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে তদন্ত চলছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক শূন্যতা দ্রুত পূরণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
সচেতন মহল মনে করে, একটি উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরস্পরনির্ভর। ইউএনও, ওসি, সার্কেল কর্মকর্তা, এসি ল্যান্ডসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর সুশাসন অনেকাংশেই নির্ভর করে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকলে তদারকি ও জনসেবায় চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে সরকারি জমি রক্ষা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, জলাশয় ও পরিবেশ সংরক্ষণ, নৌপথের নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের নিয়মিত মাঠউপস্থিতি প্রয়োজন। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা আন্তরিক হলেও একাধিক এলাকার দায়িত্ব একসথে পালন করায় সব জায়গায় সমানভাবে নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সাথে হাওরাঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকার কথা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নিকলীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো দ্রুত পূরণ করে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হোক। তাদের মতে, হাওরের মানুষের জন্য কার্যকর জনসেবা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দৃশ্যমান ও নিয়মিত উপস্থিতির বিকল্প নেই।



