আ’লীগ নেতার প্রেসে নিম্নমানের কাগজ ৫ প্রতিষ্ঠানকে এনসিটিবির সতর্কবার্তা

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • বিনামূল্যের বই মুদ্রণে শুরুতেই কারসাজি
  • মান নিয়ন্ত্রণে নজর রাখছে একাধিক টিম

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপা শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই বেশ কিছু প্রেস মালিক কাগজের কারসাজি শুরু করেছেন। দু’দিন আগে আওয়ামী লীগের এক নেতার প্রেসে জব্দ করা হয়েছে নিম্নমানের ১০০ টন কাগজ। এ ছাড়াও অন্তত পাঁচটি প্রেসে পাওয়া গেছে বই ছাপার অনুমোদনের বাইরে কম জিএসএমের (নিম্নমানের) কাগজ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা এসব প্রেসকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করে গতকাল সোমবার সতর্কতার চিঠিও দিয়েছেন। একইসাথে অন্যান্য প্রেসকেও শুরু থেকেই এবার কঠোর নজরদারিতে রাখছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৬ আগস্ট থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই (প্রাক-প্রাথমিকের) মুদ্রণকাজ শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০টি লটে মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি আমার বই মুদ্রণের কাজ শুরু হয়েছে। এই বই মুদ্রণের দায়িত্ব পেয়েছে ১১টি প্রেস। এই প্রেসগুলোর মধ্যে পাঁচটি প্রেসেই নি¤œমানের কাগজ এবং বইয়ের সাইজে অমিল ধরা পড়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা রব্বানী জব্বার যিনি স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আশীর্বাদ নিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত (যদিও বিনাভোটে) হয়েছিলেন। তার মালিকানাধীন আনন্দ প্রিন্টার্স থেকে এক শ’ টন নি¤œমানের কাগজ জব্দ করেছেন এনসিটিবি ও বই ইন্সপেকশন এজেন্টের (পিডিআই) কর্মকর্তারা।

অপরদিকে সাগরিকা প্রিন্টার্স নামের (মালিক গিয়াস উদ্দিন) অন্য একটি প্রেস থেকেও নি¤œমানের কাগজ জব্দ করা হয়েছে। সেখানে বই ছাপার কাজে ব্যবহৃত তিন হাজার ফর্মা কাগজ জব্দ করে নষ্ট করা হয়েছে। লেটার অ্যান্ড কালার নামের (মালিক সিরাজুল ইসলাম) একটি প্রেস থেকে প্রাক-প্রাথমিকের বইয়ের সাইজে কারচুপির অভিযোগে বেশ কিছু মুদ্রিত বই জব্দ করা হয়েছে। বইয়ের সাইজে যেখানে দৈর্ঘ্যে ৯ দশমিক ৫ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ৭ দশমিক ২ ইঞ্চি থাকার কথা সেখানে প্রস্থে কারচুপি করা হয়েছে। এই বই বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছে এনসিটিবি। টাঙ্গাইল অফসেট প্রেসের মালিক মীর এমদান হোসেন রানা- তিনি তার প্রেসের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না দেখিয়ে হাতিম প্রিন্টিং নামে অন্য একটি প্রেসের ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট দিয়ে কাজ করার আবেদন করেছেন। এটা বড় ধরনের অনিয়ম ও কারসাজি বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির এক কর্মকর্তা। পরে এই প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। সরকারি প্রেসেও একইভাবে বই ছাপার কাজে ব্যবহৃত নি¤œমানের কাগজ জব্দ করা হয়েছে। সরকারের প্রেসের মালিক ওমর ফারুক ৪০ টন কাগজ অনুমোদনের আবেদন জানালে সেখানে ৭ টন কাগজ নি¤œমানের পাওয়া যায়। পরে এই ৭ টন কাগজ রিজেক্ট বা বাতিল করা হয়েছে। গাজীপুরের বারোতোপা প্রেসেও ৫২ টন নি¤œমানের কাগজ জব্দ করা হয়েছে। পরে তাদেরকেও সতর্ক করে চিঠি দেয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার বিকেলে এবং সন্ধ্যায় কয়েক দফায় আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রব্বানী জব্বারের মুঠোফোনে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদেবার্তা দিয়েও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। অপর দিকে সাগরিকা প্রিন্টার্সের মালিক গিয়াস উদ্দিন এই প্রতিবেদককে জানান, যেসব কাগজ রিজেক্ট করা হয়েছে সেগুলো ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের আমাদের পরীক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত কাগজ। পরে আমরা ভালো কাগজে বই মুদ্রণের কাজ শুরু করেছি। লেটার অ্যান্ড কালার প্রেসের মালিক সিরাজুল ইসলামকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। টাঙ্গাইল অফসেট প্রেসের মালিক নয়া দিগন্তকে জানান, আমার কর্মচারীর ভুলের কারণে আমাদের প্যাডে অন্য একটি প্রেসের নাম লেখা হয়ে গেছে। পরে অবশ্য আমরা সঠিক ভাবে আবার আবেদন করেছি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানান, এবার যেকোনো মূল্যে আমরা ভালো মানের বই নিশ্চিত করতে চাই। তাই প্রথম থেকেই আমাদের এনসিটিবির টিম, পিডিআই টিম এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও সর্বদা প্রেসগুলোর ওপরে সজাগ দৃষ্টি রাখছেন। আশা করছি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা অতীতের যেকোনো বছরের তুলনায় এবার ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ভালো মানের বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পারব।