যুক্তরাষ্ট্রের নেপথ্য নায়ক আর্জেন্টাইন কোচ

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ

নিউ ইয়র্ক থেকে

নিউ ইয়র্ক শহরে বিশ্বকাপের কোনো খেলা নেই। নিউ ইয়র্কের পাশের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালসহ আটটি ম্যাচ। নিউ ইয়র্কে খেলা না থাকলেও প্রতিদিনই ম্যানহাটন, জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইট, ব্রুকস এলাকায় বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দলগুলোর জার্সি গায়ে ফুটবলভক্তদের দেখা মিলবে। এসব সমর্থকের অধিকাংশই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, মেক্সিকোর। এদের অনেকেই বিশ্বকাপ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রেই থাকেন। তবে যাদের দেশে বিশ্বকাপ সেই যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে কাউকে চোখে পড়েনি। অবশ্য যেসব ভেনুতে যুক্তরাষ্ট্রের খেলা সেখানে নিজ দেশের জাতীয় দলের জার্সিধারী দর্শকদের ঢল নামে। আসলে নিউ ইয়র্কবাসী বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা ব্যস্ত বাস্কেটবল নিয়ে। যেখানে এবার দীর্ঘ ৫৪ বছর পর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নিউ ইয়র্ক নাইচ। নিউ ইয়র্কের মতো অন্য শহর তথা রাজ্যেও একই অবস্থা। দেশটিতে জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে ফুটবল। অথচ এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এবারের বিশ্বকাপের নকআউটে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেটা আবার ৯৬ বছর পর পাওয়া সাফল্যের ফলে। আর তা সম্ভব হয়েছে আর্জেন্টিনার কোচ মাওরিচিও পচেত্তিনোর কল্যাণে।

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের শুরু থেকেই অংশগ্রহণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এ নিয়ে ১২ বার তারা খেলছে বিশ্বকাপে। সে অর্থে দেশটিতে আরো জনপ্রিয় হওয়ার কথা ছিল ফুটবল। কিন্তু স্থানীয়দের মধ্যে বাস্কেটবলের প্রতিই প্রবল ঝোঁক। এরপর আমেরিকান ফুটবল, বেসবল এসব খেলার জনপ্রিয়তা। তবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফুটবলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তোলার চেষ্টা চলছে। আর জাতীয় দলও বিশ্বকাপে দারুণ খেলে সেই মিশনকে সহায়তা দিচ্ছে।

এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে টানা দুই ম্যাচে জয় পেল যুক্তরাষ্ট্র, যা ১৯৩০ সালের পর এই প্রথম। উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামকে ৩-০ এবং প্যারাগুয়েকে ৩-০ গোলে হারায়। ৯৬ বছর পর ফের গ্রুপ পর্বে টানা দুই জয় মার্কিনিদের। এবার তারা প্রথম ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ এবং দ্বিতীয় খেলায় অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ গোলে বিধ্বস্ত করে। এতে তাদের ঠাঁই হয়েছে নকআউট পর্ব বা সেরা ৩২-এ।

তাদের এই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়টা এসেছে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ান প্যারিসিচকে ছাড়াই। প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়া উভয় দলের বিপক্ষেই আত্মঘাতী গোল পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যে ম্যাচে আত্মঘাতী গোল পেয়েছে সেই ম্যাচ হারেনি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র।

যাই হোক, দলটিকে এই পর্যন্ত আনার নেপথ্য কারিগর আর্জেন্টিনার কোচ মওরিসিও পচেত্তিনো। এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ম্যাচে ৪-১ গোলে জয় পায় ল্যাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে মার্কিন দলের সবচেয়ে বেশি গোল দিয়ে জয়। সে সাথে ১৯৩০ সালের পর প্রথম এত বড় ব্যবধানে জয়। এরপর দ্বিতীয় খেলায় অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ হারের স্বাদ দেয়া।

পচেত্তিনোর ৪-২-৩-১ ফরমেশনের খেলাই সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই উঠতি খেলোয়াড়দের ওপর নজর দিয়েছেন। বিভিন্ন একাডেমির সাথে যোগাযোগ রেখেছেন। একই সাথে ফুটবলারদের টেকনিক্যালি ও ফিজিক্যাল উন্নতিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। উঠতি খেলোয়াড়দের মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন। এরই যোগ ফল এবারর বিশ্বকাপে সাফল্য। এখন দলটির গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচ গ্রুপ থেকে বিদায় নেয়া তুরস্কের সাথে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে উঠেছে পাঁচবার। এর মধ্যে ২০০২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলাটা আধুনিক ফুটবল বিশ্বকাপে সেরা অর্জন। যদিও তারা প্রথম বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান পাওয়া দল। এ ছাড়া তারা ১৯৯৪, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল।

এবার তাদের এই ছুটে চলায় বড় আশা সবার মনে। যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো মনে করছে এবার বিশ্বকাপ জিতবে পচেত্তিনোর দল। ৫৪ বছর বয়সী পচেত্তিনো তার কোচিং ক্যারিয়ারে ইল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পার, চেলসি এবং ফ্রান্সের প্যারিস সেইন্ট জার্মেই দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে ২০ ম্যাচ খেলেছেন। ২০০২ বিশ্বকাপেও খেলেন তিনি।