খুলনায় ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ

আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের প্রস্তুতি নিন : ডা: শফিক

Printed Edition
খুলনায় ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে বক্তৃতা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান  : নয়া দিগন্ত
খুলনায় ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে বক্তৃতা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

খুলনা ব্যুরো

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আপনারা ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছেন। এখন নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানাতে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকুন। জনগণের দেয়া গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে এ বিষয়ে সমাধান না হলে যেখানে কথা বলতে স্পিকারের অনুমতি প্রয়োজন হয় না, সেখানেই আমরা জনগণের সাথে কথা বলব। গতকাল শনিবার বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সমাবেশে আরো বক্তৃতা করেন- লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব:) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন ও কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক মোবারক হোসাইন, জামায়াতের খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো: ইজ্জত উল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি, খুলনা মহানগরী আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, খুলনা জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমির উপাধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম মুকুল, বাগেরহাট জেলা আমির মাওলানা রেজাউল করিম, ঝিনাইদহ জেলা আমির আলী আজম মো: আবু বক্কর এমপি, যশোর জেলা আমির অধ্যাপক মো: গোলাম রসূল এমপি, মেহেরপুর জেলা আমির মাওলানা তাজ উদ্দীন খান এমপি, নড়াইল জেলা আমির মো: আতাউর রহমান বাচ্চু এমপি।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডা: শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ ও দুর্বল করার মাধ্যমে জনগণের অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছিল। এসব করার পর হাসিনা পালিয়ে গেছেন; কিন্তু তার কোনো অনুশোচনা নেই। উপরন্তু তিনি আবার ফিরে আসছি বলে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। সুড়সুড়ি না দিয়ে ফিরে এসে দেখেন। আমরা কারোর রক্তচক্ষুকে পরোয়া করি না।

জামায়াত আমির বলেন, তাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়; বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি বলেন, আমরা দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না; কিন্তু অন্যায়, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না। সীমান্তে পুশইন পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে দেশের জনগণ ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী একসাথে কাজ করবে।

যুব সমাজের প্রতি লক্ষ্য করে জামায়াত আমির বলেন, দেশের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে ২৪-এর জুলাইয়ের মতো আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই বিপ্লব কোনো দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য নয়; বরং দুর্নীতি, বৈষম্য, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। একটি দুর্নীতিমুক্ত, চক্রান্তমুক্ত, দলীয় প্রভাবমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য দেশের যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে।

সভাপতির বক্তৃতায় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় জোটের খুলনা বিভাগীয় সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার তা থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে এসেছে। গণভোটে জনগণ যে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, সংসদ এবং রাজপথ- দুই জায়গাতেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলন চলবে। জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ১১ দলীয় জোট তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।

কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বলেন, নানা রাজনৈতিক কৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশার সরকার প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যারা ইসলামী মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা ও সুশাসনের কথা বলে, তাদেরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উগ্রবাদী বা মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, এ সরকার সংস্কার না মানলে, মানতে বাধ্য করতে হবে। তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ আর গণভোটের সাথে বিএনপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন মিলে অন্তহীন প্রতারণা করেছে। বিএনপি তলে তলে না ভোটের ক্যাম্পেইন করেছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ওপর হাসিনা ও আওয়ামী ভূত সওয়ার হয়েছে। হাসিনার মতো তারাও ভাবছে জনগণ প্রতারণা ধরতে পারবে না। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, জনগণের রায় ও ভোটাধিকার নিয়ে কোনো ধরনের ছিনিমিনি খেলা উচিত হবে না।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় লড়াই রয়েছে- রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তবায়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করা। জনগণের আকাক্ষার বিরুদ্ধে কোনো আপস করা হবে না। সংস্কার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমরা রাজপথে যেমন ছিলাম, ভবিষ্যতেও তেমনি থাকব। বিএনপির সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, খুলনাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করা হয়েছে। কেসিসি, কেডিএ, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো তার বড় প্রমাণ। তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

রাশেদ প্রধান বলেন, চব্বিশের শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি আমরা বরদাশত করব না। আমরা হিন্দুস্তান আর বিএনপির অক্ষর চিনি না, শুধু জুলাই চব্বিশের রক্তের অক্ষর চিনি।