রুহুল আমিন সৌরভ কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী বারোবাজার। শত শত বছর আগে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন জনপদের অনেক চিহ্ন সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে মাটির স্তর সরতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক প্রাচীন স্থাপনার নিদর্শন। ইতিহাসের তেমনি এক অনন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে বেলাট দৌলতপুরের ঐতিহ্যবাহী গোড়ার মসজিদ।
কালীগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বারোবাজার ইউনিয়নের বেলাট দৌলতপুর মৌজায় মাত্র তিন শতক জমির ওপর নির্মিত চার গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদ। সরকারি তথ্যে এটিকে ইসলামী ঐতিহ্যের এক অনন্য স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সামনে দাঁড়ালে কেবল একটি প্রাচীন মসজিদই নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের এক রূপ রূপায়িত হয়। ১৯৮৩ সালে বারোবাজারে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও খননকাজ শুরু হলে মাটির নিচ থেকে মসজিদটি পুনরুদ্ধার করা হয়।
জনশ্রুতি রয়েছে, ভারতের ফুরফুরা শরীফের বড় হুজুর এখানে এসে পুনরায় নামাজ চালুর নসিহত করেন। এরপর স্থানীয়রা এটি পরিষ্কার করে সালাত আদায় শুরু করেন। পরে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর এটি সংস্কার করে। বর্তমানে প্রতি জুমায় প্রচুর লোকসমাগম ঘটে; মূল মসজিদ ছোট হওয়ায় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মুসল্লি আশপাশের মাঠে মুছাল্লা বিছিয়ে নামাজ আদায় করেন।
মসজিদের নির্মাণকাল নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও গবেষকদের মতে, এটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ অথবা তার ছেলে নসরত শাহের শাসনামলে তৈরি। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ‘গোড়াই’ নামের এক সুফি সাধক এখানে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। মসজিদের পাশে থাকা একটি প্রাচীন কবরকে অনেকে তার কবর মনে করলেও এর ঐতিহাসিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
বর্গাকৃতির এই মসজিদের দেয়াল প্রায় পাঁচ ফুট প্রশস্ত। পূর্ব দেয়ালে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণেও প্রবেশপথ রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব এবং কালো পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। দেয়ালে পোড়ামাটির তৈরি পাতা, ফুল, শিকল ও ঘণ্টার নকশা দর্শণার্থীদের নজর কাড়ে। পূর্বদিকের পুকুর ও প্রাচীন ঘাটের ভগ্নাবশেষ প্রমাণ করে একসময় এটি সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিল।
মসজিদটির পরিচালনা পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে ব্যাংকের দু’টি হিসাবের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। জুমার দিনে মানত ও নগদ দান থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় হয়, যা মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও একটি মাদরাসার চালনায় ব্যবহৃত হয়। এখানে বেতনভুক্ত ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন আছেন। খুলনার প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের সাইট পরিচালক গোলাম মোস্তফাও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্বের পাশাপাশি মসজিদকে ঘিরে রয়েছে পর্যটনেরও সম্ভাবনা। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকায় মসজিদটির নাম রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস ও প্রতœসম্পদের সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও এ ধরনের স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু শুধু প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেই এর দায়িত্ব শেষ নয় বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। নিয়মিত সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড, দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা এবং স্থানীয় ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উপস্থাপন নিশ্চিত করা গেলে গোড়ার মসজিদ আরো বড় পরিসরে পরিচিতি পাবে বলে মত প্রকাশ করেছেন স্থানীয় প্রবীণরা।



