- সমীক্ষাহীন, বারবার ডিজাইন পরিবর্তন ও দীর্ঘসূত্রতা
- ব্যয় কমলেও ২ দফায় মেয়াদ বেড়েছে আড়াই বছর
- ঋণদাতার নানা শর্তের বেড়াজাল
বিধান থাকলেও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই শুরু হওয়া ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) থমকে আছে। মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়েও প্রকল্প সমাপ্ত হওয়া এখন শঙ্কায়। রাজধানীর নির্বাচিত কয়েকটি এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, জনসাধারণের চলাচল সহজ করা, উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি, নিরাপদ নগর পরিবেশ গড়ে তোলা এবং জলবায়ু সহনশীল নগরব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে নেয়া হয়েছিল ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্প। কিন্তু প্রকল্পটি শুরুর সাত বছর পরও কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বরং পরিকল্পনার দুর্বলতা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) না করা, বিশ্বব্যাংকের একাধিকবার নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং প্রশাসনিক বিলম্ব প্রকল্পটিকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলেছে। দাতা সংস্থা বিশ^ব্যাংকের নানা শর্তের বেড়াজালে প্রকল্পটি কাক্সিক্ষত গতি হারিয়েছে। চলতি সালের মে মাস পর্যন্ত সোয়া সাত বছরে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৬০.৮০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৭২ শতাংশ ।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, ঢাকা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র এবং দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জোগানদাতা। গত চার দশকে দ্রুত নগরায়ন ও অভিবাসনের ফলে এখানকার জনসংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ দূষণের মতো বহুমুখী নগর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭৯ সালে যেখানে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ, তা ২০১৫ সালে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখে পৌঁছেছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত এলাকাগুলোতে (কামরাঙ্গীরচর, বাসাবো, সূত্রাপুর-নয়াবাজার-ফুলবাড়িয়া এবং খিলগাঁও-মুগদা-বাসাবো) নাগরিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, যাতায়াত ও বসতিব্যবস্থার উন্নয়ন, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রথমে প্রকল্প ৮৮০ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য একনেক থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। পরে ব্যয় কমিয়ে ৮০১ কোটি ৮৪ লাখ ৬২ হাজার টাকায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুমোদন দেয়া হয়। পরে ব্যয় আরো কমিয়ে ৫০৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় করা হয়। আর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুমোদন দেয়া হয় বলে সোসিও ইকোনমিক ডেভেলপমন্টে অর্গানাইজেশন ফর দি পুওর (সিডোপ) জানিয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় কার্যক্রম:
প্রকল্প দলিলের তথ্যানুযায়ী, কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে, ৯টি নতুন কমিউনিটি সেন্টার, ২২.৭২ কিলোমিটার ড্রেন উন্নয়ন, ১৯.৪১ কিলোমিটার ফুটপাথ উন্নয়ন, এক হাজার ২১টি স্ট্রিট লাইট, ৪৭১টি ট্রাফিক সাইন, আট হাজার ১২১টি গাছ রোপণ, তিনটি কঠিন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, একটি সংরক্ষণাগার ভবন এবং পার্ক, পুকুর ও ঐতিহ্যবাহী ভবনের উন্নয়নসহ একাধিক অবকাঠামো নির্মাণ।
শুরুতেই পরিকল্পনায় বড় ঘাটতি:
পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের যেকোনো বিনিয়োগ বা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ৮৮০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি কোনো পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়াই অনুমোদন দেয়া হয় ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির। পরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পের কিছু অংশের জন্য আলাদাভাবে সমীক্ষা করা হলেও, শুরুতে প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবতা যাচাই না করায় বাস্তবায়ন পর্যায়ে একের পর এক জটিলতা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না থাকায় প্রকৃত ব্যয় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি, বাস্তব ঝুঁকি আগে থেকে চিহ্নিত হয়নি, একাধিকবার প্রকল্প সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে এবং সময় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। সাত বছর দু’ মাসে অর্থাৎ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিভুক আর্থিক অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ। এখন আট মাসে ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করতে হবে।
বারবার নকশা বদল:
পর্যালোচনার তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্প চলাকালে বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় কমিউনিটি সেন্টার, রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাথ, পার্ক ও পুকুর উন্নয়নের নকশা একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। এতে ঠিকাদারদের কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং নতুন করে নকশা অনুযায়ী নির্মাণ পরিকল্পনা সাজাতে হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হয়েছে।
পরিকল্পনায় ছিল, বাস্তবে বাদ:
দলিলের তথ্য বলছে, ডিপিপিতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর উন্নয়ন, কামরাঙ্গীরচরের সাথে ঢাকার সংযোগে লোহার সেতু নির্মাণ এবং শাহজাহানপুর ঝিল উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাখা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত প্রকল্পে এসব বড় কার্যক্রম বাদ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সাথে বাস্তবায়নের উল্লেখযোগ্য অমিল তৈরি হয়েছে।
কিছু এলাকায় হয়নি প্রত্যাশিত উন্নয়ন:
মাঠপর্যায়ে তথ্য থেকে আইএমইডির প্রতিষ্ঠান সিডোপের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, প্রকল্পের আওতায় থাকা চারটি এলাকার মধ্যে কামরাঙ্গীরচরে ১৬টি কার্যক্রমের অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। সেখানে শুধু একটি সেকেন্ডারি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। যার অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ। অন্য দিকে মুগদা এলাকায় প্রকল্পের আওতায় উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি। তবে মূল্যায়নে দেখা গেছে, স্ট্রিট লাইট, ট্রাফিক সাইন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে অগ্রগতি অত্যন্ত কম। স্ট্রিট লাইট স্থাপনে মাত্র ৫.৮৯ শতাংশ, ট্রাফিক সাইনে ৭.৯৩ শতাংশ এবং গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে প্রায় ২ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে।
আইএমইডি প্রকল্পটি নিয়ে যা বলছে:
আইএমইডির প্রতিষ্ঠান সিডোপের প্রকল্প মূল্যায়নে বলছে, এত বড় ব্যয়ের একটি প্রকল্প সমীক্ষা ছাড়া অনুমোদন দেয়া ও নেয়াই হলো বড় সমস্যা। এ ছাড়া প্রকল্পে ডিএসএম পরামর্শক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব, বিশ্বব্যাংকের চাহিদায় কাজের পরিধি পরিবর্তন, একাধিকবার নকশা পরিবর্তন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, আইডিএ ঋণের আংশিক বাতিল এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্যাকেজ পুনঃসংশোধন প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করছে। বড় প্রকল্পে শুরুতেই বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করলে পরবর্তী সময়ে ব্যয়, সময় এবং কাজের পরিধি বারবার পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে জনগণ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের দক্ষতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।



