পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণে স্থবিরতা

সোয়া ৬ বছরে অগ্রগতি ২৬.৩৪ শতাংশ, কাজ বন্ধ ঠিকাদারের

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

অপরিকল্পিত প্রকল্প প্রণয়ন, নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, ঠিকাদার ও পরামর্শকের মতবিরোধ এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে পটুয়াখালীর পায়রা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতু প্রকল্পটি মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। প্রায় ছয় বছর তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৬.৩৪ শতাংশ। বর্তমানে মূল সেতুর নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, আর্থিক সঙ্কটের কথা জানিয়ে ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, কচুয়া-বেতাগী-পটুয়াখালী-লোহালিয়া-কালাইয়া সড়কের ১৭তম কিলোমিটারে পায়রা নদীর ওপর ১ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের জন্য ২০২০ সালের ১০ মার্চ একনেকে ১ হাজার ৪২ কোটি ২৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রথমে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে তা এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ৬০০ মিটার সংযোগ সড়ক, এক কিলোমিটার গাইড বাঁধ, টোল প্লাজা ও টোল মনিটরিং ভবন, ওজন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রকৌশল সুবিধা নির্মাণ এবং প্রায় সাড়ে আট হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৬.৩৪ শতাংশ

২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ২০.৪৬ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ২৬.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের অধিকাংশ অতিবাহিত হলেও কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

রাজস্ব খাতে ৬০ কোটি ৮৪ লাখ ৯১ হাজার টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৫৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা, যা বরাদ্দের ২০.৬৬ শতাংশ। অন্য দিকে মূলধন খাতে ৯৫১ কোটি ৭ লাখ ১২ হাজার টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭১ কোটি ৫ লাখ ৪ হাজার টাকা বা ১৭.৯৯ শতাংশ।

মূল সেতুর কাজ কার্যত শুরুই হয়নি

প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মূল সেতু ও ভায়াডাক্ট নির্মাণে বরাদ্দ রয়েছে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ। অথচ এ খাতের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ১০.৯৯ শতাংশ। চূড়ান্ত নকশা অনুমোদন না হওয়ায় মূল সেতুর টেস্ট পাইল, ২০২টি ওয়ার্কিং পাইল, পাইল ক্যাপ, পিয়ার শ্যাফট, পিয়ার ক্যাপ, বক্স গার্ডার ও ডেক স্ল্যাব নির্মাণের কাজ শুরুই করা যায়নি। অন্য দিকে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ এখনো শুরু হয়নি। নদী শাসন কাজের অগ্রগতি ২৬.০৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণ প্রায় শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।

নকশা জটিলতায় দীর্ঘ বিলম্ব

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মূল সেতুর নকশা নিয়ে মতবিরোধের কারণে প্রকল্প অন্তত ১৮ মাস পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘প্যানেল অব এক্সপার্টস’-এর সভায় এ বিরোধের সমাধান হয়। পরে এপ্রিল মাসে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত নকশা জমা দেয়। তবে নকশা চূড়ান্ত হলেও মাঠপর্যায়ে মূল সেতুর নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি।

ওয়ার্কিং পাইলের অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ

প্রকল্পের ভায়াডাক্ট অংশে টেস্ট পাইলের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ২০২টি ওয়ার্কিং পাইলের মধ্যে অগ্রগতি ৬৯.২৩ শতাংশ এবং পাইল ক্যাপের কাজ ৬২.৫০ শতাংশে আটকে রয়েছে। ফলে সুপারস্ট্রাকচার নির্মাণ পর্যায়ে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।

পরামর্শক ব্যয়ে কোটি কোটি টাকা

প্রকল্পে তিনটি খাতে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ডিজাইন পরামর্শক বাবদ ১২৬ জন-মাসের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৪১ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং নির্মাণ তদারকিতে ৫৬৬ জন-মাসের জন্য ২৫ কোটি ২৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এ দু’টি খাতে মাসিক গড় ব্যয় প্রায় ১৬ লাখ টাকা। পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক বাবদ আরো প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন রয়েছে।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণ

আইএমইডির নিয়োজিত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান আইসিসিএল-অ্যাভিনিউ সেভেন জয়েন্ট ভেঞ্চারের নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারী, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে জটিলতা, এলাইনমেন্ট পরিবর্তন, কাজের পরিধি বৃদ্ধি এবং ডিজাইন-বিল্ড পদ্ধতিতে নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স ও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, সময়ক্ষেপণ এবং চুক্তিগত জটিলতার কারণে প্রকল্পে সময় ও ব্যয় উভয় ঝুঁকিই বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

‘ঠিকাদার কাজ করছে না’

প্রকল্প পরিচালক মো: তোফাজ্জল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, “ঠিকাদারকে কোনোভাবেই কাজ করানো যাচ্ছে না। তারা জানিয়েছে, তাদের আর্থিক সঙ্কট রয়েছে। ফলে বর্তমানে মূল সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।”