নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধে হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগী ও আত্মীয়-স্বজনরা ক্ষোভে ফুঁসছেন, কারণ সুস্থ না হতেই তাদের হাসপাতাল ত্যাগ করতে হবে। একই সাথে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা-পেশাজীবীরা অন্যতম। কারণ, বেসরকারিভাবে নারী ও শিশুবান্ধব এমন স্বল্প খরচের হাসপাতাল নগরীতে একটিও নেই। তারা বলছেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল কোনো সমাধান হতে পারে না; বরং যারা নবজাতকের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাদের বিচার করে শাস্তি দেয়া হোক। অন্য দিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের যে নোটিশ উল্লেখ করা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তারা আদ্-দ্বীন হাসপাতালের প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ দিয়েছে। নাম্বার হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতর প্যাথলজি সেন্টারের নাম্বারই উল্লেখ করেছে বলে আদ্-দ্বীনের আইনজীবী শিশির মনির উল্লেখ করেছেন। তিনি হাসপাতাল ও প্যাথলজি সেন্টারের নাম্বার উল্লেখ করে প্রশ্ন করেছেন, ‘এটা কি অবহেলা, না সুচিন্তিত?’
হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হাসপাতাল বন্ধ কাম্য নয়, কারো দোষ প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হোক।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। এ ব্যাপারে গতকাল শুক্রবার এনডিএফের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক ডা: মো: নজরুল ইসলাম এবং জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা: মো: মাহমুদ হোসেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল দেশের দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য স্বল্প ব্যয়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। মানবিক ও সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানটি লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমরা দাবি করছি, ঘটনার প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট সমস্যার দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। ওই ঘটনায় কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভুল বা দায়িত্বে অবহেলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের বিপুল রোগীর চিকিৎসাসেবা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে।
বিশিষ্ট ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফিশিয়াল সার্জন ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডা: সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, (হাসপাতাল) বন্ধ করা সহজ, প্রতিষ্ঠান গড়া খুব কঠিন। তারচেয়েও কঠিন- নিয়ম-নীতি মেনে প্রতিষ্ঠান চালানো।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এক দিনে তৈরি হয়নি। বহু কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে আদ্-দ্বীন হয়ে উঠতে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর শাস্তি অবশ্যই হতে হবে; কিন্তু সে শাস্তি কি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা? বরং নবজাতক মৃত্যুর বিচার আইনানুগভাবে হতে পারতো। অথবা বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেতে পারতো মৃত নবজাতকের পরিবার। পাশাপাশি হাসপাতালের যা কিছু সমস্যা তা সমাধান করার শর্তসাপেক্ষে হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ দেয়া যেত। ডা: সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ আরো বলেন, শুধু আদ্-দ্বীন নয়, বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো হাসপাতালেই খুঁজলে কিছু না কিছু অনিয়ম পাওয়া যাবে; কিন্তু তা এক্সপোজড (প্রকাশ) হয় না। যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে, তখনই কেবল সেখানে সমস্যাটা এক্সপোজড হয়। সব হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা উচিত। কোথাও সমস্যা পেলে অল্প সময়ের মধ্যে তা সংশোধনের নোটিশ দিতে হবে। সে সময়ের মধ্যে শর্ত মেনে আপ টু ডেট না করলে সোজা লাইসেন্স বাতিল (করা যেতে পারে)। তিনি বলেন, ‘আমরা চমক চাই না’।
সংসদ সদস্য বিশিষ্ট ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কেন বন্ধ হয়েছে জানেন? কারণ এই হাসপাতাল থেকে শাইখ মোখতার আহমদ, শাইখ আহমদ উল্লাহর মতো হুজুররা তাদের স্ত্রী, মা-বোনদের চিকিৎসা করান পর্দা সহকারে তাও স্বল্প খরচে। তাই বন্ধ হয়েছে। তিনি শাইখ মোখতার আহমদকে উদ্ধৃত করে বলেন, মোখতার আহমদ বলেন, ‘অবশেষে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দিলো সরকার। দ্বীনি পরিবেশে সামর্থ্যরে মধ্যে চিকিৎসা নেয়ার এমন সুন্দর ব্যবস্থা হয়তো নিকট ভবিষ্যতে আর দেখা যাবে না।’
বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট রুস্তম আলী মধু ফেসবুকে বলেন, ‘মিডিয়ার চাপে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল কতটা যুক্তিসঙ্গত হলো, তা সময়ই বলে দেবে।’ এক ব্যাংকার রুহুল আমিন গাজী বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালের রেফারেন্সের আলোকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সব বাস কোম্পানির লাইসেন্স/রুট পারমিটও কি বাতিল হবে?’
ফেসবুক ব্যবহারকারী এম শাখাওয়াত হোসেন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘মাইলস্টোন ঘটনায় যদি বিমানবাহিনী বন্ধ না হয়...তাহলে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কেন বন্ধ হবে ?’ সাংবাদিক মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি প্রতিষ্ঠান আগে গড়ে তুলুন। তারপর বন্ধের সিদ্ধান্ত নিন।’
নিবন্ধন বাতিলের এক দিন পর অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কার্যক্রম। স্বাস্থ্য অধিদফতরের বেঁধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী সেবা চালু থাকলেও বন্ধ রয়েছে নতুন রোগী ভর্তি। হাসপাতাল বন্ধের খবরে আতঙ্ক বিরাজ করছে ইতোমধ্যে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে। হাসপাতালের এমন পরিস্থিতির কারণে অনেকেই চিকিৎসা সম্পন্ন না করেই হাসপাতাল ছাড়ছেন। তেমনই একজন রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নাজুমুন্নাহার। ছয় দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এই রোগীর ডায়ালাইসিস চলছিল। তবে নিবন্ধন বাতিলের নির্দেশের পর চিকিৎসা নিয়ে শঙ্কায় হাসপাতাল ছাড়ছেন তিনি। নাজমুন্নাহারের ছেলে নুরুজ্জামান বলেন, ‘সেবার মান ও কম খরচের চিন্তা করে বহু বছর যাবৎ এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। এবারো আম্মাকে ডায়ালাইসিসের জন্য এখানে ভর্তি করেছিলাম; কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শুনে চলে যাচ্ছি।’ কোথায় যাবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনো ঠিক করিনি। দেখি কোথায় যাওয়া যায়, ভাবছি কিডনি ইনস্টিটিউটে যাবো।’ খালেদা আক্তার নামে আরেক রোগীর স্বজন বলেন, ‘এত বড় একটা হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে আমরা যাবো কোথায়? সরকারি হাসপাতাল কী চিকিৎসা দেয় তা তো আপনারা জানেনই। আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ কম খরচে ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে আসি, এটাও নাকি সরকার বন্ধ করে দেবে।’ রোগী বাঁচাতে হাসপাতাল বন্ধ করা কেমন সিদ্ধান্ত- এই প্রশ্ন তুলে খালেদা বলেন, ‘হুট করে হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে। আমার রোগী আইসিইউতে ভর্তি, এখন আমি কোথায় যাবো?’
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে বর্তমানে মোট ২৪৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে শিশু আইসিইউতে ৫০ জন, আইসিইউ ও এইচডিইউতে ১৩ জন এবং করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ছয়জন রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশনায় সাধারণ রোগীরা হাসপাতাল ছাড়লেও সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে মূলত এসব মুমূর্ষু রোগী।



