বিশ^কাপে দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকম্যান ডেভিড

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

২৯ মিনিট, প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে এবং ম্যাচ শেষের যোগ করা সময়ে নিজের তৃতীয় গোলটি করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন জোনাথন ডেভিড। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিক দেশের হয়ে হ্যাটট্রিক করা মাত্র ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নাম লেখান। দীর্ঘ ৬০ বছর পর কোনো স্বাগতিক দেশের খেলোয়াড় বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করলেন। এর আগে সর্বশেষ এই কীর্তি গড়েছিলেন ১৯৬৬ সালের ফাইনালে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি জিওফ হার্স্ট। চলতি বিশ^কাপে এটি দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। এর আগে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটিট্রিকটি করেছিলেন আর্জেন্টাইন সেনশেসন লিওনেল মেসি।

এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়; এটি কানাডার বিশ্বকাপ ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নেওয়ার পাশাপাশি স্বাগতিক দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে তারা। একই সঙ্গে অন্তত ছয় গোলের ব্যবধানে বিশ্বকাপে জয় পাওয়া দলগুলোর বিরল তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে কানাডা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটা কানাডার প্রথম জয়। এর আগে ১৯৮৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপে মোট ৬ ম্যাচ খেললেও একবারও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি। অবশেষে তৃতীয় বিশ্বকাপে এসে প্রথম জয়ের দেখা পেল কানাডা, ঐতিহাসিক জয়টা গোল উৎসব করে স্মরণীয় করে রাখল।

জোনাথন ডেভিডের এই হ্যাটট্রিক কেবল তিনটি গোলের গল্প নয়, এটি এক নতুন কিংবদন্তির জন্মের গল্প। বহু বছর ধরেই ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজের সামর্থ্যরে জানান দিয়ে আসছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে, স্বাগতিক দেশের কোটি দর্শকের সামনে এমন এক প্রদর্শনী তিনি উপহার দিলেন, যা তাকে নিয়ে গেল অন্য এক উচ্চতায়।

মাঠে ডেভিডকে দেখে কখনোই মনে হয় না তিনি বাড়তি আবেগে ভাসেন; বরং ঠাণ্ডা মাথা, নিখুঁত পজিশনিং আর সুযোগ কাজে লাগানোর অসাধারণ দক্ষতাই তাকে আলাদা করেছে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা যখন তার গতিপথ বুঝতে ব্যস্ত, তখনই তিনি খুঁজে নেন গোলের রাস্তা। প্রথম গোলটি ছিল আক্রমণাত্মক মানসিকতার প্রতিফলন, দ্বিতীয়টি তার চমৎকার ফিনিশিংয়ের উদাহরণ আর তৃতীয় গোলটি ছিল একজন পরিণত স্ট্রাইকারের নিখুঁত শিল্পকর্ম।

এই হ্যাটট্রিকের পর ডেভিড আর শুধু কানাডার তারকা নন, তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত নাম। ২০০০ সালে নিউ ইয়র্কে জন্ম হলেও তার বেড়ে ওঠা কানাডায়। অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে সাফল্যের পথে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কখনো থেমে থাকেননি। ধাপে ধাপে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, প্রথমে বেলজিয়ামের লিগে, এরপর ফ্রান্সের ক্লাব ফুটবলে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন।

বিশ্বকাপের আগে অনেকেই বলেছিলেন, স্বাগতিকের চাপ হয়তো ডেভিডকে আটকে দেবে। কিন্তু তিনি প্রমাণ করলেন, বড় খেলোয়াড়রা চাপকে ভয় পান না, বরং সেটাকেই শক্তিতে রূপ দেন। পুরো স্টেডিয়াম যখন তার নাম ধরে গর্জে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল এটি শুধু একজন ফুটবলারের নয়, বরং একটি দেশের স্বপ্নপূরণের উৎসব।

আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, ডেভিডের খেলার ধরন। তিনি কেবল গোল করেন না, দলের আক্রমণভাগকে সংগঠিত করেন, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেন এবং প্রয়োজন হলে রক্ষণেও সাহায্য করেন। আধুনিক ফুটবলের একজন পূর্ণাঙ্গ ফরোয়ার্ড বলতে যা বোঝায়, তার সব গুণই যেন রয়েছে তার মধ্যে।

৬০ বছর পর স্বাগতিক দেশের কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক। এই পরিসংখ্যান ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও ডেভিডের অর্জন আরও বড়। তিনি নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। দেখিয়েছেন, মেধা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে বিশ্বমঞ্চেও নিজেকে সেরাদের কাতারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

বিশ্বকাপ এখনো অনেক বাকি। সামনে আরো কঠিন পরীক্ষা, আরো বড় প্রতিপক্ষ। কিন্তু এই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বের আলোটা যেন জোনাথন ডেভিডের দিকেই কেন্দ্রীভূত। হয়তো কয়েক বছর পর এই বিশ্বকাপকে মনে করা হবে সেই আসর হিসেবে, যেখানে এক তরুণ স্ট্রাইকার নিজেকে কিংবদন্তির পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আর সেই যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম জোনাথন ডেভিডের অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিক।

জন্মগ্রহণ করেন ২০০০ সালের ১৪ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে। তবে তার শিকড় ক্যারিবীয় দেশ হাইতিতে। মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি পাড়ি জমান কানাডায়। বেড়ে উঠেনে ওতোয়া শহরে। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। নামকরা অ্যাকাডেমিতে নয়, বরং স্থানীয় ক্লাব ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই নিজের প্রতিভা বিকশিত করেন। কৈশোরে তার স্বপ্ন ছিল এক দিন ইউরোপের বড় কোনো ক্লাবে খেলা, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব কেএএ জেন্টে। প্রথম মৌসুমেই গোল করে নজর কাড়েন এবং দ্রুতই বেলজিয়ান লিগের অন্যতম সেরা তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। এরপর ২০২০ সালে ফরাসি ক্লাব লিলে ওএসসিতে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন। সেখানে ক্লাবটির লিগ শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ব্রুকলিনে জন্ম, হাইতির শিকড়, কানাডায় বেড়ে ওঠা জোনাথন ডেভিড যেন বহুসংস্কৃতির এক প্রতীক, যার পায়ের জাদু আজ মাতাচ্ছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কানাডার এই নির্ভীক গোলশিকারি।