- গত ১০ বছরে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে মৃত্যু ২ শতাধিক
- কাজে আসছে না প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ের বজ্র নিরোধক দণ্ড
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ২৩টি হাওরে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। দিগন্তজোড়া ফসলের বাম্পার ফলনে কৃষকের মনে আনন্দ থাকার কথা থাকলেও সেখানে জেঁকে বসেছে মৃত্যুভয়। বৈশাখের এই সময়ে হাওরে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ধুম লেগেছে, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মরণঘাতী বজ্রপাত। আকাশে মেঘের সামান্য ঘনঘটা দেখলেই ধান কাটা ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়াচ্ছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। গত কয়েক দিনে জেলায় বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় হাওরজুড়ে এখন তীব্র উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
মাটিয়ান হাওরের কৃষক জহির মিয়া তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আকাশ এই ভালো, এই মন্দ। মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে বজ্রপাত শুরু হলে জান নিয়ে টানাটানি পড়ে। গত শনিবারও আমাদের এলাকায় একজন মারা গেছেন। এখন মেঘ দেখলেই কামকাজ ফেলে জীবন বাঁচাতে দৌড় দিতে হয়। বজ্রপাতে মৃত্যু হলে এই আনন্দ আর থাকে না। টাঙ্গুয়ার হাওরের কৃষক আরিফ আহমেদ জানান, বজ্রপাতের ভয়ে বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিকেরা মাঠে নামতে চাইছেন না। এতে সময়মতো ধান ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি নানা হিসেবে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল প্রতি বছরই দীর্ঘ হচ্ছে। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের তথ্য মতে, ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় শতাধিক মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে ১১ জন, ২০২১ সালে ১১ জন, ২০২২ সালে ২৪ জন এবং ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ২৯ জনে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্তই জেলায় সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে হাওর পাড়ের বাসিন্দাদের মতে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গত ১০ বছরে সুনামগঞ্জে অন্তত দুই শতাধিক কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছেন।
গত শনিবার দুপুরে একদিনেই জেলার জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও দিরাই উপজেলায় পাঁচজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। এদিন মাটিয়ান হাওরে ধান কাটার সময় তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামের আবুল কালাম (২৮) ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত হন নূর মোহাম্মদ (২৪) নামের আরেক যুবক, যাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেটে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: নওশাদ আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মরণঘাতক এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্র নিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে তাহিরপুর উপজেলায় রয়েছে তিনটি যন্ত্র। তবে এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ সরকারি কর্মকর্তারাই সন্দিহান। জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসিবুল হাসান বলেন, বজ্র নিরোধক মেশিনগুলোর কার্যকারিতা কতটুকু আছে, তা আমাদের জানা নেই। তবে আহতদের আমরা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছি।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক তোজাম্মিল হক বলেন, সুনামগঞ্জ দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। এখানে লোক দেখানো কয়েকটি যন্ত্র বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারকে টেকসই ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কৃষক-শ্রমিকেরা সাহস নিয়ে মাঠে কাজ করতে পারেন।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শাহরুখ আলম শান্তনু বলেন, ঝোড়ো বৃষ্টি বা বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হলে কৃষক ও শ্রমিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাউকে হাওরে অবস্থান না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান তিনি।


