রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আলোচনা

সংসদে জুলাই সনদ ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাহাস

Printed Edition
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান

সংসদ প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, গণভোট এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়েছে। এ নিয়ে অধিবেশনে উত্তেজনাও ছড়ায়। কেউ কেউ গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়েও প্রতিযোগিতার অভিযোগ তোলেন।

বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এমপি ও মন্ত্রীরা এসব বক্তব্য দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল পর্যায়ক্রমে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। পরে অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

আইনমন্ত্রীর সমালোচনা ও ধন্যবাদ : আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বক্তব্যের শুরুতে বিরোধী দলসহ সব সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২৬-এ বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণে আনা সংশোধনীতে কার্যত কোনো বিরোধিতা হয়নি, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

তবে তিনি বিরোধী পক্ষের প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনায় “জুলাই সনদ”-এর উল্লেখ না থাকাকে “সংবিধান ও আইনের সাথে প্রতারণা” বলে অভিহিত করেন। তার মতে, এতে গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা প্রতিফলিত হয়নি এবং জাতীয় ঐকমত্যের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান সময়ে অর্থনীতি পুনর্গঠন, কৃষক ও নি¤œ আয়ের মানুষের সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এসবের পরিবর্তে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুতে বিতর্ক হচ্ছে।

‘আপনারা কি কোনো বিশেষ শক্তিকে খুশি করতে চান?’

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম তার বক্তব্যে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বিএনপির মতো বড় দলে যোগ্য নারী নেত্রী থাকা সত্ত্বেও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানা আওয়ামী লীগের এক নেত্রীকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর।

তিনি প্রশ্ন রাখেন- “আপনারা কি কোনো বিশেষ শক্তিকে খুশি করতে চান?”

রাষ্ট্রপতিকে নিয়েও সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি অতীতে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের নীরব সাক্ষী ছিলেন। সেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জানানো নিয়ে তিনি আপত্তি জানান।

এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলেই তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্ত হয়ে সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বন্ধের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।

তিনি আরো দাবি করেন, গত ১৬ বছরে জামায়াতে ইসলামীর ওপর ব্যাপক নির্যাতন হয়েছে এবং শীর্ষ নেতাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরেন।

গণভোট নিয়ে সংশয় : রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান গণভোটের ফলাফল শপথের মাধ্যমে কার্যকর করার দাবি জানান। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও গণভোটের বিষয়ে শপথ না নেয়ায় আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

তার ভাষায়, “শেষ পর্যন্ত আমও যাবে, ছালাও যাবে”- অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ

বগুড়া-৫ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দল-মত নির্বিশেষে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন এবং কোনোভাবেই ব্যাংকটি লুটপাটকারীদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়।

“রাজনীতি শিখুন”- সেতুমন্ত্রী

ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে এবং এটি জনগণের পার্লামেন্ট।

তিনি দাবি করেন, ৭১ শতাংশ মানুষ “জুলাই সনদ”-এর পক্ষে মত দিয়েছে, যার মধ্যে ৫১ শতাংশ বিএনপির প্রস্তাবিত কাঠামোর পক্ষে। বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “রাজনীতি শিখুন, মানুষকে বিভ্রান্ত করে লাভ নেই।”

আমি আতঙ্কিত হই- অমিত

যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপির শত শত নেতাকর্মী শহীদ হলেও দলীয় নেতৃত্ব কখনো কৃতিত্ব দাবি করেনি।

বিরোধীদলীয় নেতার আচরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি আতঙ্কিত হয়ে যাই, যখন দেখি তিনি যেকোনো বিষয়ে ক্ষেপে যান।”

চেতনা বিক্রি নয়, ধারণ করতে হয়

নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ফারজানা শারমিন বলেন, আগে একটি দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবহার করে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়েছে, এখন আরেকটি দল জুলাই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।

তিনি বলেন, “চেতনা বিক্রি নয়, ধারণ করতে হয়।”

বিরোধী দলকে সতর্কবার্তা : স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলন হঠাৎ করে হয়নি; এর পেছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল। বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না, আমরা অতীত ভুলে যাইনি।”

জামায়াত-শিবিরের সাথে আলোচনা হয়নি : পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল হক বলেন, জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তাদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে জামায়াত-শিবিরের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি; বরং বিএনপির সাথে সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সংসদে আবেগঘন মুহূর্ত : ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান গুম-খুনের প্রসঙ্গ তুলে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “তার পরিবার কি কখনো কবর জিয়ারত করতে পারবে না?” এ সময় অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়।

রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, তিনি রাষ্ট্রপতির পদকে সম্মান করলেও ব্যক্তি রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাতে পারেননি।

অন্য দিকে মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তিনি দাবি করেন, যেভাবে জিয়াউর রহমান জনগণের আস্থা অর্জন করেছিলেন, তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জনগণের সমর্থন পাচ্ছেন।

সংসদের এ দিনের আলোচনায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনের মূল্যায়ন ঘিরে তীব্র বিতর্ক দেখা যায়, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আগামী বাজেট প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা : তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমান সংসদ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিফলন। অতীতের সংসদগুলোর তুলনায় এটি বেশি বৈচিত্র্যময়।

তিনি বলেন, সরকার প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শেয়ারবাজারে লেনদেন বেড়েছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও উন্নতি হয়েছে বলে তিনি জানান।

মন্ত্রী আরো বলেন, আগামী বাজেট প্রায় আট লাখ কোটি টাকার হতে যাচ্ছে, যা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বিরোধী দলকে সংসদের ভেতরে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’র দিন ফোন বন্ধ ছিল কেন? : বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান রাষ্ট্রপতিকে ‘গণহত্যার সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে ধন্যবাদ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে রাষ্ট্রপতি সরকারের সব কর্মকাণ্ডে নির্বিঘœ সহযোগিতা করেছেন। তাই তাকে ধন্যবাদ জানানোর কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।

বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, অতীতে জামায়াত তাদের নিঃস্বার্থভাবে সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু এখন তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় কারাবন্দী থাকার পাশাপাশি তার পরিবারও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’র প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ওই দিন কেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার ফোন বন্ধ ছিল। তার মতে, বিষয়টি জাতির সামনে পরিষ্কার হওয়া উচিত।

তিনি সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, ‘সংবিধান মানুষের জন্য’ এবং জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান সম্ভব।

সরকার সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাবে : প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সরকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কাজ করছে। কিছু মহল অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলেও সরকার তা অতিক্রম করবে।

জুলাই এক মাসের বিপ্লব ছিল না

বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে এক করে দেখা ঠিক নয়।

তার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম রয়েছে এবং এটি একটি ধারাবাহিক আন্দোলনের ফল। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ শুধু একটি জোটের নয়, এটি জাতীয় দলিল।’

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সমালোচনায়

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, গণতন্ত্রে সমালোচনা স্বাভাবিক। সংসদে বিতর্ক হবে, মতভেদ থাকবে- এটাই গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদের বাইরে সরকার পতনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া গণতান্ত্রিক ভাষা নয়।

তিনি আরো বলেন, বিরোধী দল সরকারের ভুল তুলে ধরবে, আর সরকার তা সংশোধনের চেষ্টা করবে- এই পারস্পরিক সম্পর্কই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

অন্যান্য বক্তার বক্তব্য

আলোচনায় আরো অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন, তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং বিএনপির সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়া।

বক্তারা সামগ্রিকভাবে সংসদীয় বিতর্কে শালীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।