মেজর সিনহা হত্যার ৬ বছর, মামলার রায় বাস্তবায়ন আর কত দূর!

বিচার বিলম্বে বেড়েই চলেছে যন্ত্রণার ক্ষত : শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস

Printed Edition

জি এ এম আশেক উল্লাহ কক্সবাজার অফিস

সেনাবাহিনীর সাহসী ও চৌকস কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে যখন নিঃশেষ করা হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ওসি প্রদীপের ‘থানার আয়না ঘরে’ আরো কয়েকজনকে ক্রসফায়ারের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। সিনহা হত্যার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেলে প্রাণে বেঁচে যায় তারা। কিন্তু এর আগে ওসি প্রদীপ বাহিনী ক্রসফায়ার দিয়ে উখিয়া টেকনাফের ১৬১ জনের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। এভাবে প্রতি সপ্তাহে চলছিল বন্দুকযুদ্ধের গল্পে হত্যার মিছিল। অবশেষে মেজর সিনহার জীবনের বিনিময়ে সেই ‘হত্যা মিছিল’ থামলেও ও শেষ হয়নি স্বজনদের পরিবারে শোকের অধ্যায়। বহুল আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত সেই মেজর সিনহার হত্যার ছয় বছর পূর্ণ হয়েছে। এখন সবার একটাই প্রশ্ন সিনহা হত্যার রায় বাস্তবায়ন আর কতদূর!

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত ৯টায় কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন এই সেনা কর্মকর্তা। বর্বর এই হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলার বিচার শেষে ২০২২ সালে ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত পুলিশের ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো: লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। দণ্ডিতদের আপিলে উচ্চ আদালতে মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে।

সূত্র জানায়, বিচারপতি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মোহাম্মদ সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ কক্সবাজার দায়রা জজ আদালতের রায়ই বহাল রাখেন। ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণার প্রায় ৯ মাস অতিবাহিত হলেও এই চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতি থেমে আছে অ্যাপিলেট ডিভিশনে দণ্ডিতদের রিভিউতেই।

এ বিষয়ে মেজর সিনহার বোন এবং মামলার বাদি শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌসের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের।

তিনি জানান, ‘এখন অ্যাপিলেট ডিভিশনে রিভিউ পেন্ডিং এবং আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে রায় কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর মনে হচ্ছে। তবে বিলম্বের সুনির্দিষ্ট কারণ সংশ্লিষ্ট বিচারিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করলেও পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর পর দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকছে, যা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের বিষয়। সর্বশেষ উচ্চ আদালতে রিভিউ-সংক্রান্ত কার্যক্রম গত বছরের জুন মাসে সম্পন্ন হয়। কিন্তু এর পর থেকে মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতির বিষয়ে কোনো নতুন পদক্ষেপ বা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় আপিল, রিভিউ বা অন্যান্য বিচারিক ধাপ সম্পন্ন হতে সময় লাগতে পারে। এ বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ সম্মান করি। তবে একটি ধাপের নিষ্পত্তির পর পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে যদি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় এবং সে বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। আমাদের মূল উদ্বেগ বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি নয় বরং প্রতিটি ধাপের মধ্যবর্তী দীর্ঘ বিরতি নিয়ে। আমরা প্রত্যাশা করি, আইনানুগ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করে মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রম যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে এগিয়ে যাবে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিষয়টির একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

শহীদ মেজর অব: সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান শুধু আমাদের পরিবারের একজন সদস্য ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মেধাবী, সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষ, যিনি তার চরিত্র, মানবিকতা এবং কর্মের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতা, বিনয়, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধ তাকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদবিতে নয়, বরং তার সততা, আদর্শ ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত।

তার স্বপ্ন ছিল দেশকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা, তরুণদের অনুপ্রাণিত করা এবং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সাহস ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়া। আজও দেশের নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও স্মরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একজন মানুষের জীবন তার আয়ু দিয়ে নয়, বরং তার আদর্শ, মূল্যবোধ ও মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা দিয়ে পরিমাপ করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, তার জীবন, আদর্শ ও আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে সত্যিকারের মহত্ত্ব মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হলো, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হোক, যাতে ন্যায়বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিতই না হয়; বরং তা দৃশ্যমানভাবেও প্রতিফলিত হয়। একটি বহুল আলোচিত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পরিবারের মানসিক কষ্টকে আরো দীর্ঘায়িত করে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়।

আমরা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই, আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে মামলাটির অবশিষ্ট বিচারিক কার্যক্রম যথাসম্ভব দ্রুত এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। একই সাথে আমাদের বিশ্বাস, সময়োপযোগী ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাই পূরণ করবে না, বরং দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থাকেও আরো সুদৃঢ় করবে। শহীদ মেজর অব: সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণ হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। আমাদের দাবি প্রতিহিংসার নয়। আমাদের দাবি কেবল আইনানুগ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী ন্যায়বিচার।

বিচারিক আদালত রায়ে বলেছেন, বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলী মেজর সিনহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপের সাথে ষড়যন্ত্র করে উপর্যুপরি গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে মেজর সিনহাকে দেরিতে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ছাড়াও ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ও হত্যার আলামত ধ্বংস করতে তিনি সিনহা ও তার সঙ্গী সিফাতের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে লিয়াকত শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। প্রদীপের শাস্তির কারণ জানাতে গিয়ে আদালত জানান, মেজর সিনহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপরাপর আসামিদের সাথে নিয়ে পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অপর আসামিদের সহায়তায় সিনহাকে হত্যা করে। শুধু তা-ই নয়, বুকে লাথি মেরে সিনহার পাঁজরের হাড় ভেঙে দেয় এবং গলার বাম পাশে নিজের পা দিয়ে সজোরে চেপে মৃত্যু নিশ্চিত করে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজার কারণ হিসেবে আদালত বলেন, সিনহা হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা, হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য সিনহার গাড়িতে ইয়াবা, গাঁজা উদ্ধার নাটক এবং সিনহাকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা ও তার সঙ্গীকে মারধর করা।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, ‘মেজর সিনহার সাথে যা করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বর্বরোচিত ঘটনা। বিশেষ করে প্রদীপের আচরণ ছিল অবর্ণনীয়। এ প্রসঙ্গে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার উদ্দিন হেলালী বলেন, মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ড অতীতের সব ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে। মেজর সিনহা ছিলেন একজন তরুণ চৌকস সেনা কর্মকর্তা। সিনহার এমন নির্মম মৃত্যুতে শুধু কক্সবাজারে নয় সমগ্র দেশের মানুষের ভেতর তীব্র প্রতিক্রিয়া এখনো বিরাজমান। দেশের মানুষ যত দ্রুত সম্ভব রায় বাস্তবায়ন চায়।

ওসি প্রদীপের গুলিতে নিহত উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ইউনিয়নের মেম্বার মওলানা বখতিয়ার আহমদের ছেলে একই ইউনিয়নের মেম্বার হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ওসি প্রদীপের ফাঁসি কখন কার্যকর হবে সেই প্রতিক্ষায় আমরা রয়েছি। তিনি আরো বলেন, মেজর সিনহার শাহাদাতের বিনিময়ে বেঁচে গেছে শত প্রাণ। নইলে ওসি প্রদীপ ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত উখিয়া টেকনাফে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বলে অনেককে হত্যা করত।’