মাছ-ডিম-সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি চরম চাপে সাধারণ মানুষ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। এক দিকে মাছ, ডিম ও মুরগির দাম বেড়েছে, অন্য দিকে টানা বৃষ্টির প্রভাবে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে মাছ ও সবজির বাজার। এক সময় সাধারণ মানুষের আমিষের অন্যতম সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে বিবেচিত পাঙ্গাশের দামও কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। আর সামুদ্রিক মাছের বেশির ভাগই সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। একই সাথে কাঁচামরিচের দাম প্রায় ৪০০ টাকা এবং গোল বেগুনের দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে উঠেছে।

এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আয় না বাড়লেও খাদ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় বাড়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষ।

গতকাল রাজধানীর মিরপুর, দুয়ারীপাড়া ও পল্লবীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাছের দামে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কম দামের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙ্গাশের দামও এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। বাজারে জীবিত পাঙ্গাশ বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে। মান ও আকারভেদে চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, টেংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি কইয়ের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা এবং শোল মাছ প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ দিকে চাষের শিং মাছের দাম আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। অন্য দিকে বড় আকারের শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে কেজিতে হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছের বাজারে পরিস্থিতি আরো কঠিন। ইলিশ বিক্রি হচ্ছে আকার ভেদে ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। সাদা রূপচাঁদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, লাল কোরাল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং টুনা ৮৫০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজার ও মাছের আকারভেদে দামে কিছুটা তারতম্য রয়েছে।

দুয়ারীপাড়া বাজারে মাছ বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, বাজারে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু দাম বেশ চড়া। ক্রেতারা আগের তুলনায় কম পরিমাণে মাছ কিনছেন। মাছের পাশাপাশি বেড়েছে ডিমের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ডজন সাধারণ ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, ব্রয়লার মুরগি বর্তমানে প্রায় ১৯০ টাকা কেজি এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মুরগির দাম প্রতিদিনই ৫ থেকে ১০ টাকা ওঠানামা করছে। মুরগি ব্যবসায়ী ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘এ সপ্তাহে মুরগির দাম গত সপ্তাহের মতোই আছে। তবে প্রতিদিন কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা ওঠানামা করে। আজ ব্রয়লার ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি।’ গরুর গোশতের দাম এ সময়ে স্থির রয়েছে। রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি গরুর গোশত ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির গোশত ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ দিকে সবজির বাজারেও ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির কোনো খবর নেই। টানা বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি ও সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা বলে বিক্রেতারা উচ্চমূল্যকে যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা করছেন। বাজারে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে। কাঁচা মরিচের দাম জাত ও মানভেদে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি। অর্থাৎ কাঁচা মরিচের দামও এখন ৪০০ টাকা ছুঁয়েছে।

এ ছাড়া ঢেঁড়স ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০, কাঁকরোল ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, লাউ ৮০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা, টমেটো ১৩০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা, শসা ১০০ টাকা, কচুরলতি ৮০ টাকা, ধুন্দুল ১০০ টাকা, বরবটি ১২০ টাকা এবং লতি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। জালি প্রতি পিস ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার ফসলের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে কাঁচামরিচের গাছ নষ্ট হওয়ায় সরবরাহ কমেছে। একই সাথে টানা বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক জমি থেকে সময়মতো সবজি তুলতে পারেননি। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে।

মিরপুর ৬ নং সেকশনের বাজারের সবজি বিক্রেতা মোজাম্মেল হক বলেন, কয়েক দিন ধরে সবজির দাম বাড়তি। বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং কাঁচামরিচের গাছ নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা অনেক জায়গায় খেত থেকে সবজি তুলতে পারছেন না। এতে বাজারে সরবরাহ কমেছে।

পল্লবী বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সাদিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে সবজির দাম অস্বাভাবিক বেশি। বিক্রেতারা বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় তো বাড়েনি। এত বেশি দামে নিয়মিত সবজি কেনা কঠিন।

তিনি বলেন, বাজারে এখন এক-দুইটি সবজি ছাড়া বেশির ভাগের দামই ১০০ টাকার ওপরে। ফলে সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে অন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হচ্ছে।

মাছ কিনতে আসা রুবেল আহমেদ বলেন, প্রায় প্রতিটি মাছের দাম বেড়েছে। মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এভাবে মাছ কিনে খাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই সময়ে মাছ, ডিম ও সবজির দাম বাড়ায় ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মাছ ও সবজির মতো দৈনন্দিন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তা সরাসরি পরিবারের মাসিক খাদ্যব্যয়ে প্রভাব ফেলে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে কোনো একটি পণ্যের দাম সাময়িকভাবে বাড়লে ভোক্তা বিকল্প পণ্য বেছে নিতে পারেন। কিন্তু মাছ, ডিম, মুরগি ও সবজির মতো একাধিক নিত্যপণ্যের দাম একই সময়ে বাড়লে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ফলে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ে।

তারা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজারে একসাথে কয়েকটি খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করা হোক। তা না হলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্যতালিকায় আরো কাটছাঁট করতে হতে পারে।