নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে আর কোনো আয়না ঘর থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়না ঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধীদের তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন এই দেশে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদের সেই অন্ধকার অধ্যায় আমরা চিরতরে বন্ধ করব।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে গুম হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের আর্তি তুলে ধরেন এবং গুমের সাথে জড়িতদের বিচার দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব গুমের শিকার এই পরিবারগুলোর আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, আরো করবে।
গুম পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি তীব্র বেদনা নিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি, বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সব মানুষকে, স্মরণ করছি সেইসব মা-বাবা-ভাই-বোনদের যারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন এই বুঝি তাদের সন্তান, তাদের স্বজন ফিরে এলো।
তিনি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতা বিরোধী অপরাধ । গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক সামাজিক স্বস্তি । এটা জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেড় দশকে ফ্যাসিবাদ সরকার আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা আয়না ঘর, দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্ন মত পোষণ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখন আন্দোলন করেছেন তখনই তাদের জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবাহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে। আমরা ভুলে যাইনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলামসহ অগণিত মানুষকে। যাদের পরিবারের প্রতিটি রাত কাটছে বুক ভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা নিয়ে। আইনজীবী ব্যারিস্টার অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন মতালম্বী কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক,সমাজকর্মী।
তিনি বলেন, মঞ্চে উপবিষ্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে গুম করে ভিন দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছেন। এ দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশের বেগম খালেদা জিয়াকে এই সময় পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি যিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম খুনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম খুন অত্যাচার নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী সহ ফ্যাসিবাদ বিরোধী সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তর জনগণকে যাদের অনেককে গুম করে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
গুম পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এখন প্রতিশোধ নয় প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সঙ্কট, মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা জীবিকা ও পূনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।



