নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের পুঁজিবাজারে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিরেক্ট লিস্টিং বিধিমালার খসড়া ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে যা আজকের কমিশন সভায় অনুমোদন লাভ করবে, এমনটি জানিয়েছেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর জনমত যাচাই শেষ করেই তা চূড়ান্ত করা হবে। এরই পরই কয়েক মাসের মধ্যে দেশীয় ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় চলে আসবে। এমনকি একে একে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডেপোজিটরি বাংলাদেশ (সিডিবিএল) ও সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশের (সিসিবিএল) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একে একে পুঁজিাবাজরে তালিকাভুক্ত হতে হবে।
গতকাল সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সম্মেলন কক্ষে ‘চলমান পুঁজিবাজার পরিস্থিতি ও তা উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক এক উন্মুক্ত আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক নেতিবাচক আচরণের কারণে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা হিসাবে পুঁজিবাজারের সব স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে এ উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিএসই)। ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ সভায় বিএসইসির সব কমিশনার, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ও পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টসহ সব অংশীজনের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করে উন্মুক্ত আলোচনায় তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বিগত দুই মাসে আমরা মূল কাজগুলো অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে পুঁজিবাজারের চলমান অনাস্থা কেটে যাবে। বাজারের গভীরতা যখন বাড়বে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ যখন তৈরি হবে তখন তারা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী না হয়ে পারবে না। কিন্তু এই অনাস্থার ভাব একদিনে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি হলেই তা এমনিতেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
পুঁজিবাজার প্রাইমারি রেগুলেটর হিসাবে ডিএসইর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজার রেগুলেট করার বিষয়টি পুরোপুরি ডিএসইর। প্রাইমারি রেগুলেটর হিসাবে কোম্পানির তালিকাভুক্ত, ট্রেডিং রেগুলেশন সব তাদের হাতে থাকবে। বিএসইসি বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরির কাজ করবে। কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বিএসইসি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। তালিকাভুক্তির জন্য আসা কোম্পানিকে বিএসইসি কোনো প্রশ্নও করবে না। পুরো কাজটিই ডিএসই সম্পন্ন করবে। আর এ মুহূর্তে বিএসইসি ও ডিএসই এই মনোভাব নিয়েই কাজ করে চলেছে।
বিভিন্ন পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারে অপ্রয়োজনীয় নজরদারি করা হচ্ছে মর্মে যে কথা উঠছে সে প্রসঙ্গে মাসুদ খান বলেন, বিএসইসির পক্ষ থেকে কোনো ব্রোকার হাউজে কোনো ধরনের নজরদারি করা হয়নি। এটা ডিএসইর কাজ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তাদের এটা করতে হবে। বিএসইসি প্রয়োজন মনে করলে আকস্মিক পরিদর্শন করবে। কারণ দেখা গেছে আগে থেকে জানিয়ে কিছু করতে গেলে তাতে যথার্থ ফল মেলে না। বেশ কিছু ব্রোকার হাউজে যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে যেখানে বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারিয়েছেন তা একদিনে ঘটেনি। বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি বাজার অবকাঠামো আধুনিকায়নে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সাথে নতুন মূলধন সংগ্রহ ও বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ একত্র করে ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতিতে আইপিও চালুর বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি। এ-সংক্রান্ত নতুন বিধি এক মাসের মধ্যে দেয়া হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
লেনদেন নিষ্পত্তির সময় কমিয়ে টি+১ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। এ বিষয়ে ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে আলোচনা করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ টি+১ চালুর চেষ্টা থাকবে বলে জানান তিনি।
সিসিবিএলের কার্যক্রম আরো কার্যকর করতে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড পুনর্গঠন করা হতে পারে বলেও জানান মাসুদ খান। তার মতে, আধুনিক পুঁজিবাজারে লেনদেনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় কাউন্টারপার্টি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কাজ এগিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ওপর ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ও আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত রাখার কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাসুদ খান বলেন, বাজারে কাঠামোগত সংস্কার, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরবে।
তিনি আরো বলেন, শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও সিসিবিএলসহ বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সংস্কারের উদ্যোগগুলো বাস্তবে দৃশ্যমান হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার পথ আরো সহজ হবে। অনুষ্ঠানে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিন ধরে ‘ওভারলি রেগুলেটেড’ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত বলা হচ্ছে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজার তার নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্ক্রিপ্ট নেটিং চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য ডিএসইর ম্যাচিং ইঞ্জিন ও অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (ওএমএস) প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কাজ চলছে। অংশীজনদের সহযোগিতায় চলতি বছরের মধ্যেই এটি বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডিএসই চেয়ারম্যান আরো জানান, ওপেন-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেনও শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ডিএসইর ওয়েবসাইটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ওয়েবসাইটের নতুন নকশা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে টেকসই পরিবর্তন আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ডিএসই এবং বাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।



