নয়া দিগন্ত ডেস্ক
এক দিনে ১০টি অপচেষ্টা, নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকা ৬০ জন
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতারোহণের পর বাংলাদেশ সীমান্তে উদ্বেগজনক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০৬টি আসন জিতে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটায় বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় নতুন রাজ্য সরকার বিএসএফকে ৭২১ হেক্টর জমি হস্তান্তর করে। নির্বাচনের আগে প্রচারণায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বীরভূমের জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে প্রত্যেক অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করে দেশছাড়া করা হবে।’ বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ‘অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়নে’র প্রতিশ্রুতি ছিল। ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নামে এখন বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধ পুশইনের মাধ্যমে মানুষ ঠেলে পাঠানোর অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বিজেপি শাসিত চারটি সীমান্তবর্তী রাজ্য দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়েছে। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই সীমান্তে অস্থিরতা বাড়ছে।
গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বিএসএফ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ১০টি পৃথক পুশইন চেষ্টা চালিয়েছে, যাতে কমপক্ষে ৯০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অপচেষ্টা করা হয়। সেই তৎপরতার বিরুদ্ধে এদিন লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির পাশে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্তে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো মোট ৬০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু বর্তমানে শূন্যরেখা ও নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে আছেন।
লালমনিরহাট : রংপুর সেক্টরের সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার ভোরে লালমনিরহাট ও তিস্তা ব্যাটালিয়নের আওতাধীন সীমান্তে মোট ৩২ জনকে পুশইনের চেষ্টা হয়। লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের দিঘলটারী ও দুর্গাপুর বিওপি এলাকায় ১১ জনকে প্রবেশ করানোর উদ্যোগ নেয়া হলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাতজনকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফেরত পাঠায়; বাকি চারজন এখনো সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন চর এলাকায় রয়েছেন। তিস্তা ব্যাটালিয়নের বড়খাতা ও পঁয়ষট্টিবাড়ী বিওপি এলাকায় পৃথক দু’টি ঘটনায় আরো ২১ জনকে পুশইনের অপচেষ্টা প্রতিহত করা হয়। রংপুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম শফিকুর রহমান বলেন, গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে এবং অবৈধ পুশইনের বিরুদ্ধে বিজিবির অবস্থান অটল।
নওগাঁ : নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার ভোর ৭টায় সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি পিলার দিয়ে ভারতের ৮৮ বিএসএফ পান্নাছাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। এদের মধ্যে ছয়জন নারী, ছয়জন পুরুষ ও পাঁচজন শিশু রয়েছে। বিজিবির হাঁপানিয়া বিওপির টহলদল তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের শূন্যরেখায় আটকে দেয়। নওগাঁ ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম জানান, পুশব্যাক কার্যক্রম চলমান এবং অবৈধভাবে কাউকে দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।
পঞ্চগড় : পঞ্চগড় প্রতিনিধির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে (পিলার ৭৫৮/৫) বিএসএফের ৯৩ টিয়াপাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা কাঁটাতারের গেট খুলে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে। বিজিবি দ্রুত পদক্ষেপে তা ব্যর্থ করে দেয়। পরে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশী নাগরিক বলে দাবি করলেও ৫৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম বলেন, তাদের নাগরিকত্ব এখনো যাচাই হয়নি। ‘এভাবে ঠেলে পাঠানো কোনো স্বীকৃত নিয়মের মধ্যে পড়ে না।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ২৮ জন বৃহস্পতিবার থেকে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হলেও শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।
কুষ্টিয়া-মেহেরপুর : দৌলতপুর সংবাদদাতা জানান, ভারতীয় পুলিশ ও বিএসএফ সীমান্তের ওপারের হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে ১০ থেকে ১৫ জনের দল জড়ো করে রাতের আঁধারে পুশইনের চেষ্টা করছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের ৪৬ কিলোমিটার এবং মেহেরপুরের গাংনী সীমান্তের ৩৬ কিলোমিটার এলাকায় ৪৭ বিজিবির কড়া নজরদারিতে একটি চেষ্টাও সফল হয়নি।
এই সঙ্কটে বিজিবির পাশে প্রকৃত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন সীমান্তের সাধারণ মানুষ। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও পঞ্চগড়ে বাসিন্দারা পালাক্রমে টহলে অংশ নিচ্ছেন, মাইকিং ও বাঁশি বাজিয়ে সতর্কতা বজায় রাখছেন। দৌলতপুর সীমান্তের বাগমারী এলাকার বাসিন্দা বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘এই অবৈধ অনুপ্রবেশ আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। আমরা বিজিবির পাশে দাঁড়িয়ে সীমান্ত রক্ষা করব।’ ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, ‘এই সঙ্কটে দেশপ্রেমের যে অনন্য নজির সীমান্তবাসী স্থাপন করছেন, তার জন্য তাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। সীমান্ত সুরক্ষায় কোনো আপস নেই।’
বিজিবি জানিয়েছে, গভীর রাতে কাঁটাতারবিহীন এলাকা ও সীমান্ত ফেন্সিংয়ের গেট ব্যবহার করে বৈধ প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া এড়িয়ে মানুষ ঠেলে পাঠানোর এই পদ্ধতি বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত আচরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এদিকে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সুন্দরবনসহ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ড্রোন সার্ভেইলেন্স ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পুশইন-সংক্রান্ত তথ্য কোস্টগার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ জানাতে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।



