ট্রাম্পের দাবির মুখে আমেরিকার সাথে আলোচনার খবর অস্বীকার ইরানের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তি একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং গতকাল সোমবার থেকেই নতুন আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে বলে রবিবারে সাংবাদিকদের জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আরো দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী ব্যবহার ও শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে এই সমঝোতা হতে যাচ্ছে। এমনকি ইরানের ওপর প্রস্তাবিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আক্রমণটি বাতিল করার পেছনে এই আলোচনার অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি। তবে সোমবারের এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং এমন কোনো বৈঠকের পরিকল্পনাই নেই। আগামী দিনগুলোতে বিদেশী প্রতিনিধি দলকে আতিথেয়তা দেয়া কিংবা বিদেশে প্রতিনিধি পাঠানোর কোনো সূচিও তেহরানের নেই।

বাঘাই আরো স্পষ্ট করেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বর্তমানে ইরাকে ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় রয়েছেন এবং সব আলোচনাকারী দেশেই অবস্থান করছেন। একমাত্র যে আলোচনাটি চলছে, তা হলো হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সাথে। রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই এবং এই সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাওয়া যাবে না।

পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও অকার্যকর কৌশল

গতকাল সোমবারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি মূলত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় আগে ইসরাইলের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-এর পর থেকে তৈরি হওয়া একটি নিয়মিত ধারারই অংশ। বিগত পাঁচ মাস ধরে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে- ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার ঘোষণা দেয়া এবং শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক যোগাযোগের কথা বলে তা বাতিল করা। তবে জুলাইয়ের শুরুর দিকে সঙ্ঘাত সমাপ্তির উদ্দেশ্যে করা জুন মাসের সমঝোতা স্মারক বাতিল হয়ে যাওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের সাথে যেকোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে আসছে ইরান।

যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন- যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর হামলার সক্ষমতা কমানো এবং ধর্মীয় শাসকদের উৎখাতে ইরানিদের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করা- তার একটিও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন হামলার হুমকির মুখে ইরানও পাল্টা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী, ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় আরব মিত্র এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা জোরদার করেছে।

মার্কিন ছাড় আদায়ে তেহরানের বহুমুখী চাপ

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ, সমুদ্রসীমা এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্ঘাতের ব্যয় বাড়াতে চাইছে ইরান। সরাসরি কোনো নির্ণায়ক সামরিক বিজয় অর্জনের পরিবর্তে তারা সুনির্দিষ্ট মাত্রার উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল বেছে নিয়েছে, যাতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়েও সঙ্ঘাতের ব্যাপ্তি বাড়ানো যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের আসল উদ্দেশ্য হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এটা বোঝানো যে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের দাবি মেনে নেয়ার চেয়ে সঙ্কট ঝুলিয়ে রাখার মাশুল অনেক বেশি। তাদের স্পষ্ট বার্তা হলো- হরমুজ প্রণালীতে ইরানকে আরো বড় ভূমিকা না দিলে এই সঙ্ঘাতের আগুন পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে লোহিত সাগর ও অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল নাইটস জানান, ইরান কৌশলগতভাবে উত্তেজনার মাত্রা এমনভাবে বাড়াচ্ছে যেন প্রতি সপ্তাহে আলোচনার টেবিলে নতুন কোনো ভূগোল, নতুন অস্ত্র বা লক্ষ্যবস্তু যুক্ত করা যায়। তারা সরাসরি আমেরিকা বা ইসরাইলকে ধ্বংস করার চেয়ে আঞ্চলিক দেশগুলো ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতির মুখে ফেলে দরকষাকষির পাল্লা ভারী করছে। গালফ সূত্রের মতে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সঙ্ঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে চান না এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে চাইছে আইআরজিসি।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে চূড়ান্ত সঙ্ঘাত

হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ পরিচালনা পদ্ধতিই বর্তমানে এই বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই রুটটি গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিমান হামলা শুরুর পর মার্চে বন্ধ করে দেয় ইরান। পরে ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের পর কিছুটা শিথিল করা হলেও, শর্তের অস্পষ্টতার কারণে জাহাজের পথ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ওমান-অনুমোদিত পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজে ইরান হামলা চালালে গত সপ্তাহে প্রণালীটি পুনরায় বন্ধ হয়ে যায় এবং মার্কিন নৌবাহিনীও ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ শুরু করে।

পেন্টাগনের দাবি, জুন মাসের স্মারক অনুযায়ী কৌশলগত এই জলপথটি ইরানের খুলে দেয়ার কথা ছিল। তবে তেহরানের যুক্তি, চুক্তির শর্তে স্পষ্টভাবেই জাহাজের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তাদের সার্বভৌম কর্তৃত্বের কথা বলা হয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রমতে, ওমান ইতোমধ্যে ইরানের কাছে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে প্রণালী পরিচালনার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যার মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী ফি অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ইরান চাইছে পুরো প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে সার্ভিস চার্জ নেয়ার আইনি অধিকার। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের ফি দেয়া প্রত্যাখ্যান করে এটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে রাখার বিষয়ে অনড়। তা ছাড়া হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে উড়তে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে আইআরজিসি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এ পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি মার্কিন রিপার ড্রোন ধ্বংস করেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাজারের চিত্র

ইরানের কৌশলগত অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর চেয়ে বাণিজ্যিক পথ ও জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে নতুন সামুদ্রিক জোট গড়ে উঠছে, তা সরাসরি ইরানের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দেয়া ও সমুদ্রপথ সুরক্ষার কাজ করছে।

এ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলা স্থগিতের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে চার ডলারের বেশি কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দর ৪ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৪ ডলারে নেমে আসে। তবে বাজার শান্ত হলেও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন বাহিনী এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আক্রমণের মতো পূর্ণ প্রস্তুতিতেই রয়েছে। চূড়ান্ত বিচারে, এটি বর্তমানে দু’পক্ষের ধৈর্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ইরানি নেতৃত্বের ধারণা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা মার্কিন জোট যতদিন সহ্য করতে পারবে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় তারা এই অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করে টিকে থাকতে পারবে। দু’পক্ষই এক ধাপ উত্তেজনার জবাবে আরেক ধাপ উত্তেজনা বাড়িয়ে চললেও, শেষ পর্যন্ত যেকোনো মুহূর্তে এই হিসাব-নিকাশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।