বৃষ্টিফোঁটা জন্ম থেকেই ছিল দুষ্টু আর আনন্দপ্রিয়। সারাদিন সে মেঘের কোলে ঘুমিয়ে থাকত, আর যখনই জেগে উঠত, তখন শুরু করত দুলে দুলে ভেসে বেড়ানো। আকাশের মুক্ত বাতাসে সাঁতার কাটতে তার দারুণ ভালো লাগত।
একদিন ছোট্ট বৃষ্টিফোঁটা আকাশে মেঘের কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে একবার ডান দিকে যায়, একবার বাঁ দিকে যায়। কখনো মেঘের ওপর গড়িয়ে পড়ে, আবার কখনো মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে নিচের পৃথিবী দেখে। যখন বাতাস জোরে বইতে থাকে, তখন সে আরো আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে বেড়ায়।
একবার সে এক দুরন্ত হাওয়ার সাথে মিশে এক পাহাড়ের ওপরে চলে গেল। পাহাড়ের মাথায় থাকা মেঘগুলো তখন তাকে আদর করে বলল, ‘তুমি তো খুব খেলাধুলা করো! এবার নেমে গিয়ে গাছেদের একটু ভালোবাসা দাও না?’
কিন্তু বৃষ্টিফোঁটা তখনো মেঘের কোলে মজা করতে ব্যস্ত!
সে বলল, ‘না না, এখন না! আমি আরো কিছু দিন মেঘের কোলে ঘুরতে চাই!’
এদিকে নিচে থাকা গাছেরা বৃষ্টিফোঁটাকে দেখে একটু ঈর্ষান্বিত হলো।
বৃষ্টিফোঁটা আনন্দে উল্লাসে মেতে থাকায় গাছেদের কথা তার মনেই পড়ে না।
অথচ গাছগুলো বৃষ্টিফোঁটার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। গাছের পাতায় ধুলোবালি জমে মলিন হয়ে আছে। খাদ্য তৈরি এমনকি শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। শীতের পর বসন্ত বাতাস মলিন পাতাদের ঝরিয়ে দিয়েছে। নতুন পাতায় ছেয়ে উঠার অপেক্ষায়।
নিচে এক বিশাল বটগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আহা! যদি আমিও বৃষ্টিফোঁটার মতো মেঘের কোলে ভেসে বেড়াতে পারতাম!’
তার পাশে এক নারকেল গাছ ছিল। সে বলল, ‘তুমি তো জানোই, বৃষ্টিফোঁটা আমাদের কত ভালোবাসে? কিন্তু ও শুধু মেঘের কোলে দোল খেয়ে মজা করছে, আমাদের কথা একবারও ভাবছে না!’
বটগাছ হালকা রাগ নিয়ে বলল, ‘ঠিক বলেছ! আমরা সারাদিন রোদে শুকিয়ে যাই, আর ও আকাশে ঘুরে ঘুরে আনন্দ করে। আমাদের জন্য একটুও চিন্তা নেই!’ একটি আমগাছ অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ! যখন বৃষ্টি আসে, আমরা আনন্দে পাতা নাচাই কিন্তু এখন দেখি ও আমাদের ফেলে আকাশেই খেলছে।’
একদিন, এক মিষ্টি বাতাস এসে বৃষ্টিফোঁটার কানে কানে বলল, ‘তুমি এত আনন্দ করছ, কিন্তু গাছেরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা অভিমান করেছে, তুমি নাকি তাদের ভালোবাসো না!’
বৃষ্টিফোঁটা হতভম্ব হয়ে গেল! সে কখনো ভাবেনি যে তার মজা করার জন্য গাছেরা কষ্ট পেতে পারে। সে তাড়াতাড়ি মেঘের কোলে বসে পৃথিবীর দিকে তাকাল। নিচে গাছগুলো একটু ক্লান্ত, একটু অভিমানী মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বৃষ্টিফোঁটা এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ল! সে এক এক করে সব গাছকে ছুঁয়ে দিলো। তাদের পাতা, শাখা-প্রশাখা ভিজিয়ে দিলো।
বটগাছ খুশিতে বলল, ‘আহা! কতদিন পর আমাদের কাছে এলে! তুমি সবসময় মেঘের সাথে ভেসে বেড়াও, তোমার এত স্বাধীনতা। অথচ দেখো আমরা এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যেতে পারি না। শেকড়ের সাথে এখানেই স্থির হয়ে আছি, তাই আমি ঈর্ষান্বিত আর অভিমানী।’
বৃষ্টিফোঁটা হেসে বলল, ‘আমারও কষ্ট আছে। আমি মেঘের কোলে ভেসে বেড়াই, কিন্তু আমার স্থায়ী কিছুই নেই। আমার স্থায়ী কোনো বন্ধন নেই, তোমার রয়েছে মাটির সাথে স্থায়ী বন্ধন, তোমার শিকড় মাটির গভীরে পৌঁছেছে। আমি যেখানে যাই, কিছুক্ষণ পরই হারিয়ে যাই। আর তোমার কাছে সবসময় নতুন বীজ আসে, যারা তোমার কাছ থেকে নতুন জীবন পায়।’
বটগাছ তখন বুঝতে পারল, জীবন প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন। প্রতিটি জীবনের নিজস্ব আনন্দ এবং কষ্ট থাকে। সে বুঝতে পারল, শিকড়ের সাথে সংযুক্ত থাকা তার জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নারকেল গাছ তার পাতাগুলো দোলাতে দোলাতে বলল, ‘অভিমান করেছিলাম, কিন্তু তুমি এসেছ! এখন আমরা তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম!’
আমগাছ আনন্দে নাচতে নাচতে বলল, ‘এবার যখন মেঘের কোলে থাকবে, আমাদের কথা মনে রেখো!’
বৃষ্টিফোঁটা হেসে বলল, ‘অবশ্যই! আমি তো তোমাদেরই ভালোবাসি!’



