বিশ্বকাপটা এবার বাংলাদেশের! : জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

Printed Edition
বিশ্বকাপটা এবার বাংলাদেশের! : জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
বিশ্বকাপটা এবার বাংলাদেশের! : জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

বিশ্বকাপ ফাইনাল শুরু হতে যাচ্ছে। তবু অনেকে ছাদে গাছের ওপর পছন্দের দেশের পতাকা টানিয়ে রাখে। এমনি যখন অবস্থা তখন আমাদের ১০ বছর বয়সী পল্টু তার চিবুকে হাত দিয়ে গম্ভীর হয়ে বসেছিল। তার মনে একটাই প্রশ্ন, ‘সবাই যদি অন্য দেশের পতাকা ওড়ায়, তবে আমাদের লাল-সবুজের পতাকার কী হবে? যেমন করেই হোক ফুটবল বিশ্বকাপটা এবার বাংলাদেশকেই নিতে হবে!’

পল্টুর যেমন ভাবা, তেমন কাজ। সে ডাকল তার বিশ্বস্ত ‘বানর সেনা’ বাহিনীকে। দলের বাকি দুই সদস্য হল, তার এক বছরের ছোট পিচ্চি মন্টু আর পাড়ার সবচেয়ে ক্ষিপ্র গতির কুকুর টাইগার। যাকে পল্টু দলের এক নম্বর স্ট্রাইকার মনে করে। তারপর শুরু হল পল্টুর আসল ম্যাজিক। সে একটা ভাঙা কাঠের স্কেল টেবিলের ওপর ঠুকে বলল, শোন মন্টু, সবাই শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা করে মুখে ফেনা তুলছে। কিন্তু আসল কাপটা এবার আমরাই বাংলাদেশে রাখব। আজকেই ফাইনাল খেলা!

মন্টু চোখ গোল গোল করে বলল, কিন্তু ভাইয়া, আমাদের তো আসল ফুটবলটাই নেই! ওটা তো সেদিন শট মেরে পচা ডোবায় ফেলে দিয়েছিস।

‘ফুটবল নেই তো কী হয়েছে? বুদ্ধি তো আছে!’ পল্টুর চোখে তখন বিশ্বজয়ের ঝিলিক।

পল্টু তার মায়ের কাছ থেকে একদলা খাঁটি আটার খামির চেয়ে নিল। তারপর সেটাকে গোল করে, তার ওপর পলিথিন মুড়িয়ে, কসকসে আঁষশে টেপ পেঁচিয়ে বানিয়ে ফেলল এক ঐতিহাসিক ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ফুটবল। সাইজে একটু ছোট আর ওজনে কিছুটা ভারী হলেও ওটা দিয়েই তো বিশ্বকাপটা জয় করা সম্ভব!

এবার ট্রফির পালা। পল্টুর মা তখন দুপুরের রান্না নিয়ে ব্যস্ত। সেই ফাঁকে পল্টু ডাইনিং টেবিল থেকে মায়ের সোনালি রঙের পিতলের ঘটিটা গায়েব করে দিল। ওটার ওপর একটা প্লাস্টিকের সবুজ বাটি উপুড় করে বসিয়ে দিতেই তৈরি হয়ে গেল চকচকে ‘ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি’! তারপর শুধু অপেক্ষার পালা। বিকেল গড়াতেই পল্টুদের বাড়ির পেছনের উঠোনে শুরু হলো ‘বিশ্বকাপ ফাইনাল’। প্রতিপক্ষ দল? ওয়ান অ্যান্ড অনলি। সেই দ্রুতগতির কুকুর ‘টাইগার’।

মন্টু একটা ভাঙা প্লাস্টিকের পাইপ মুখে নিয়ে ধারাভাষ্য শুরু করল, ‘সুধী দর্শক, মারাকানা নয়, ন্যু ক্যাম্প নয়, খেলা হচ্ছে পল্টুদের উঠোন স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ বনাম রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড! খেলার শেষ মুহূর্ত। তখনো খেলা ০-০ গোলে সমতা! পল্টু তার লাল-সবুজ জার্সিটা গায়ে গলিয়ে আটার বলটা নিয়ে ড্রিবলিং শুরু করল। টাইগার ভাবল কোনো খাওয়ার জিনিস, সে ঘেউ ঘেউ করে বলের পেছনে ছুটল। পল্টু ডানে কাটাল, বামে কাটাল, তারপর টাইগারের নাকের ডগা দিয়ে এক প্রচণ্ড শট! বল সোজা গিয়ে আঘাত গোল পোস্টে।

গোওওওওল! মন্টু পাইপ হাতে চিৎকার করে উঠল। রেফারি শেষ বাঁশি বাজিয়ে দিল। ‘বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!

পল্টু বুক ফুলিয়ে দৌড়ে গিয়ে উঠোনের কোণায় রাখা পিতলের ঘটি মানে ট্রফিটা দুই হাতে মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরল। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বেলন হাতে মা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বের হয়ে এলেন, ওরে বাঁদর! আমার পিতলের ঘটি নিয়ে কী করছিস? আর আটার বল বানিয়েছিস কেন রে পাজি? পল্টু ট্রফিটা বগলে চেপে ধরে মায়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে বলল, ‘মা, পরে মারো! আগে তো দেখো, পুরো দুনিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপটা কিন্তু এবার সত্যিই বাংলাদেশে নিয়ে এসেছি!’ মায়ের হাতের বেলন নামল না ঠিকই, কিন্তু পল্টুর এমন আত্মবিশ্বাসী গোল মুখ দেখে মা-ও মুখ টিপে না হেসে পারলেন না। ওদিকে পল্টু, মন্টু আর লেজ নাড়তে থাকা স্ট্রাইকার ‘টাইগার’ মিলে উঠোনেই শুরু করে দিল বিশ্বজয়ের উল্লাস। আসলেই তো বড়রা টিভির পর্দায় যে বিশ্বকাপ খোঁজে, পল্টুরা তা এক নিমেষেই এনে দিলো বাংলাদেশের উঠোনে!