রিজার্ভ চুরি মামলায় প্রশ্নের মুখে আসামির তালিকা

প্রভাবশালী অনেকের নাম বাদ বাংলাদেশ ব্যাংকে তোলপাড়

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর একটি। ২০১৬ সালে সংঘটিত এই ঘটনা শুধু দেশের আর্থিক খাতকেই নাড়িয়ে দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। প্রায় এক দশক পরও এই ঘটনার নেপথ্য কুশীলবদের নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ চুরি-সংশ্লিষ্ট মামলার আসামি তালিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো- যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল, তাদের অনেকের নাম মামলার তালিকায় নেই। অন্য দিকে অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা, উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অবাক করা বাদ পড়া নাম : বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নির্বাহী পরিচালক দেবদুলাল রায়ের নাম না থাকা নিয়ে। দীর্ঘ দিন ধরে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বিভিন্ন মহলে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইসিটি অবকাঠামো এবং পেমেন্ট সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন। বিশেষ করে আরটিজিএস এবং সুইফট সংযোগ স্থাপনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মামলার আসামি তালিকায় তার নাম না থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। একইভাবে সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর নামও তালিকায় না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, রিজার্ভ চুরির সময় এস কে সুর বাংলাদেশ ব্যাংকের সিবিএসপি প্রকল্প, পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ ও এফআরটিএমডি-এর দায়িত্বে ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রিজার্ভ চুরির সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়।

আরটিজিএস এবং সুইফট সংযোগ নিয়ে বিতর্ক : রিজার্ভ চুরির ঘটনার অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের আরটিজিএস প্ল্যাটফর্মের সাথে সুইফট নেটওয়ার্কের সংযোগ। অভিযোগ রয়েছে, এ সংযোগ স্থাপনের সময় সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে ঝুঁকির বিষয়টি অবহিত করেননি। একইসাথে অবকাঠামোর দায়িত্বে থাকা বিভাগ থেকেও এ সংযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা আপত্তি জানানো হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত কিভাবে যথাযথ নিরাপত্তা যাচাই ছাড়াই বাস্তবায়িত হলো? বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের না করলে রিজার্ভ চুরির প্রকৃত কারণ উদঘাটন অসম্ভব।

আলামত নষ্টের অভিযোগ : রিজার্ভ চুরির পরবর্তী সময়কে ঘিরেও নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তদন্তের পরিবর্তে তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশ্লেষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, যারা অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন, তাদেরই আবার তদন্ত-পরবর্তী প্রযুক্তিগত কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়। এতে স্বার্থের সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আরো অভিযোগ রয়েছে, তদন্তসংশ্লিষ্ট কিছু ডিজিটাল ডিভাইস ও তথ্যপ্রমাণ পরবর্তীতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে স্থানান্তর বা পরিবর্তন করা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অবসরপ্রাপ্তদের নাম, কর্মরতদের বাদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অসন্তোষের জায়গা হলো- অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত হলেও বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নাম বাদ পড়েছে। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যারা এখনো দায়িত্বে আছেন এবং দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অবসরপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করলে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রশ্ন উঠবেই।’ আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলার উদ্দেশ্য যদি সত্য উদঘাটন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা সমানভাবে তদন্ত করতে হবে। কাউকে আগে থেকেই দায়মুক্তি দেয়া হলে জনগণের আস্থা তৈরি হবে না।’

এ দিকে রিজার্ভ চুরি আগে ও পরে কিছু কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে রাকেশ আস্তানাকে অনেক দিনই অফিস ছুটির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০তলা ভবনের ২৯ তলায় দেবদুলাল রায়ের অফিস রুমে মিটিং করতে দেখা গেছে। এই সময়ে রাকেশ আস্তানা বিশ্বব্যাংকের চাকরিতে ছিলেন না, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথেও কোনো কাজে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন না। প্রশ্ন উঠেছে অফিস সময়ের পর কেন রাকেশ আস্তানা দেবদুলাল রায়ের রুমে মিটিং করতে আসতেন।

অভিযোগ রয়েছে, রাকেশ আস্তানা, দেবদুলাল রায়, মসিউজ্জামান খান ও রাহাত উদ্দিন রিজার্ভ চুরির পর থেকে ২৭-২৮ দিন ধরে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে এক অজানা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের এভাবে অজানা কাজে নিয়োজিত থাকার কোনো অফিস অর্ডারও ছিল না। রিজার্ভ চুরির পর থেকে ২৭-২৮ দিন তারা কি কাজে ছিলেন, আলামত নষ্টা করা, না অন্য কোনো কাজ- তা নিয়েও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ চুরি ছিল শুধু একটি আর্থিক অপরাধ নয়; এটি ছিল দেশের আর্থিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসনের ওপর বড় ধরনের আঘাত। ফলে এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তি, কর্মকর্তা কিংবা বিদেশী সংশ্লিষ্টতার বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তাদের মতে, তদন্তে কারো পদমর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী অবস্থান বিবেচনায় নেয়া হলে প্রকৃত সত্য কখনোই সামনে আসবে না। বরং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা সমানভাবে যাচাই করতে হবে।