বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন যেভাবে বণ্টন করছে তাতে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপির মনোনয়ন তালিকা একটি সুস্পষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে, অন্যদিকে জামায়াতের মনোনয়ন থেকে বোঝা যায় যে এনসিপির সাথে তাদের জোট স্থায়ী হতে চলেছে।
জোটের মধ্যে এই আসনগুলো ছেড়ে দেয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এই কৌশলটি শুধু বর্তমান সংসদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। এই সংরক্ষিত আসনগুলোর বণ্টন জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ঐক্যকে আরো শক্তিশালী করবে। ফলে, এনসিপি ও অন্যান্য দলের মতো দলগুলো ভাবতে পারে যে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ থাকা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। তাই, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি বিএনপির বিরুদ্ধে একসাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে নারীদের প্রকৃত ক্ষমতায়নের পরিবর্তে দলীয় নেতাদের রাজনৈতিক সুবিধা বিতরণের জন্য ব্যবহৃত একটি আলঙ্কারিক হাতিয়ার হিসেবে সমালোচিত হয়ে আসছে। লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতায়নের বাইরেও এই আসনগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নারী কোটায় ৫০টি আসনের বণ্টন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি নিকট ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক গতিপথেরও একটি ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পর এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। অভ্যুত্থানের সময় ক্ষমতাচ্যুত ও পরবর্তীকালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে, ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত কিন্তু সুসংগঠিত দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি জোটের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াত ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে তাদের প্রার্থী তালিকা জমা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে যে, আগামী ১২ মে এই আসনগুলোতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, দলগুলোর জমা দেয়া নামগুলো কোনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নির্বাচিত হয়।
মনোনয়ন তালিকা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদেরকে একটি আধুনিক, অধিকার-বান্ধব এবং ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ঐক্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে এই আসনগুলোর একটি অংশ তার জোটসঙ্গীদের দিয়েছে।
এবার বিএনপি এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছে যারা সরাসরি দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত নন। উদাহরণস্বরূপ, তালিকায় রয়েছেন নিখোঁজদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী ‘মায়ের ডাক’ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, যিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে সুপরিচিত। বিএনপি ওরাও জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক এনজিও ব্র্যাকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আন্না মিনজকেও মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়াও, দলটি হিন্দু সম্প্রদায় থেকে সুবর্ণা সিকদার এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে মাধবী মারমাসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকেও প্রতিনিধি এনেছে। এর মাধ্যমে বিএনপি বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দল হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে চায়।
সংরক্ষিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিএনপির নারী প্রার্থীদের তালিকায় ১০ জনই সাবেক সংসদ সদস্য, যা অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্বারোপকেই তুলে ধরে। অতীতের আন্দোলনে সক্রিয় সাবেক ছাত্রনেত্রী মনসুরা আলমকেও মনোনীত করা হয়েছে। তবে, এর মানে এই নয় যে বিএনপি রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের জোরালো সমর্থক। ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে বিএনপি মাত্র ৯টি আসনে নারী প্রার্থী দিয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ছয়জন জয়ী হয়েছেন।
বিএনপি এই আসনগুলোকে ব্যবহার করে সুশীলসমাজের নেতা, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে। প্রধান বিরোধী দলেরও একই ধরনের সুযোগ ছিল। জামায়াত সাধারণ নির্বাচনে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনীত করেছিল, কিন্তু তিনি জয়ী হননি। সংরক্ষিত আসনের নিশ্চিত কোটার মাধ্যমে, জামায়াতের কাছে সংখ্যালঘু বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের কোনো নারীকে সংসদে নিয়ে আসার এবং নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার একটি সহজ সুযোগ ছিল।
জামায়াত তার কোটার একটি বড় অংশ জোটসঙ্গীদের দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি দেখায় যে জামায়াত নিজের ভাবমূর্তি উন্নত করার চেয়ে মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখা এবং জোটকে শক্তিশালী করাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নির্বাচনের একটি বড় চমক ছিল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। তারা ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে একাই জামায়াত ৬৮টি আসন পায়, যা দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য। এই সাফল্যের ভিত্তিতে জোটটি ১৩টি সংরক্ষিত নারী আসন লাভ করে। এর মধ্যে জামায়াত নিজের জন্য আটটি আসন রাখে। বাকি আসনগুলো সহযোগী দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হয়: একটি জাতীয় নাগরিক পার্টির জন্য, একটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য, একটি জাগপার জন্য এবং একটি জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের একজন প্রতিনিধির জন্য।
জামায়াতের মনোনীত নারীরা রাজনীতিতে নতুন নন। দলটির ১০ লাখেরও বেশি সদস্য নিয়ে একটি বৃহৎ ও সুসংগঠিত মহিলা শাখা রয়েছে। নুরুন্নিসা সিদ্দিকা ও সবিকুন নাহারের মতো মনোনীত নারীরা এই শাখার প্রবীণ নেত্রী এবং বছরের পর বছর ধরে পর্দার আড়ালে নারী ভোটারদের সংগঠিত করার জন্য কাজ করে আসছেন। নারী কোটার আসনগুলোর জন্য জামায়াতের মূল কৌশলটি জোট রাজনীতিরই প্রতিফলন। সুসংগঠিত হওয়া সত্ত্বেও, জামায়াত জানে যে, বিশেষ করে তরুণ ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার অভাব রয়েছে। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের মতো এটি এককভাবে ততটা শক্তিশালী নয়। অন্যদিকে, এনসিপি হলো জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে জন্ম নেয়া একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি। সাধারণ নির্বাচনে এনসিপি ছয়টি আসন জিতেছিল। জামায়াতের জন্য, তরুণ ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী এনসিপির মতো একটি দলের সাথে জোটবদ্ধ থাকা তার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বাড়াতে এবং তার ‘কট্টরপন্থী’ ভাবমূর্তি নরম করতে সাহায্য করতে পারে। নিজেদের সংরক্ষিত আসনের প্রায় ৪০ শতাংশ ছেড়ে দিয়ে জামায়াত কার্যকরভাবে এই জোটের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করেছে। গণভোটের মতো বিষয় নিয়ে তাদের যৌথ গণ-আন্দোলনগুলোও এই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সহযোগিতারই প্রতিফলন।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জামায়াত জোটের ১২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, অন্যদিকে এনসিপি প্রার্থী মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। (তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদানের প্রয়োজনীয় তিন বছর পূর্ণ করেননি।) তবে, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ এখনো রয়েছে।



