চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দূরত্ব কমবে ২৮ কিমি, কর্ণফুলী টানেলে বাড়বে যানবাহনের গতি

শিগগিরই শুরু হচ্ছে চন্দনাইশ-আনোয়ারা ও বাঁশখালী-চকরিয়া মহাসড়ক প্রশস্তকরণ

Printed Edition

এস এম রহমানপটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রামের আনোয়ারা-বাঁশখালী-কক্সবাজার এবং কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নীতকরণের দু’টি প্রধান আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে। প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার কমবে এবং ভ্রমণ সময় সাশ্রয় হবে অন্তত ৪৫ মিনিট। একই সাথে কর্ণফুলী টানেলে যানবাহনের গতি ও সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১,৬৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

প্রথম প্রকল্প : আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-চকরিয়া সড়ক উন্নয়ন

চট্টগ্রামের আনোয়ারা (কালাবিবির দীঘি) থেকে বাঁশখালী, টইটং, পেকুয়া, বদরখালী হয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া (ঈদমনি) পর্যন্ত ৫৮.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়কটি উন্নীতকরণ প্রকল্প ইতোমধ্যেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে। পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১,১৮৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত।

প্রকল্পটির চট্টগ্রাম অংশে ৩৬ কিলোমিটার (চারটি প্যাকেজ) এবং কক্সবাজার অংশে ২২.২০ কিলোমিটার (দুইটি প্যাকেজ) রয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ছয়টি প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে সরাসরি মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হবে।

বর্তমানে কালাবিবির দীঘি থেকে চকরিয়া পর্যন্ত মাত্র ৫.৫০ মিটার চওড়া সড়কটিকে ১০.৩০ মিটারে উন্নীত করা হবে। সংযোগ সড়কটি কর্ণফুলী টানেল-আনোয়ারা-বাঁশখালী হয়ে চকরিয়া-বদরখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৭২) মাধ্যমে জাতীয় মহাসড়ক-১-এর সাথে যুক্ত হয়েছে।

সড়কটি বর্তমানে বাঁশখালী ইকোপার্ক, পারকি ও বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত, বৈলগাঁও চা বাগান, নৌবাহিনীর সাবমেরিন ঘাঁটি, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গণ্ডামারা বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল ও কেইপিজেডসহ একাধিক শিল্পাঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অপ্রশস্ততার কারণে এখানে প্রায়ই যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটে। সড়কটি চওড়া হলে এ অঞ্চলে নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত হবে এবং স্থানীয় আর্থ-সামাজিক অবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ঘটবে।

বর্তমানে ঢাকা থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরগামী যানবাহনগুলোকে পটিয়া বাইপাস ও গাছবাড়িয়া হয়ে ১৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। নতুন সড়কটি চালু হলে যানবাহনগুলো কালাবিবির দীঘি-বাঁশখালী-পেকুয়া-বদরখালী রুটে মাত্র ৯১ কিলোমিটারে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। এতে দূরত্ব কমবে ৪০ কিলোমিটার এবং সময় সাশ্রয় হবে প্রায় ১ ঘণ্টা। অন্য দিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী যানবাহনগুলোর দূরত্ব কমবে ২৮ কিলোমিটার এবং সময় সাশ্রয় হবে ৪৫ মিনিট।

প্রধান কার্যক্রম:

ভূমি অধিগ্রহণ : ৩০.৮৬ হেক্টর

সড়ক বাঁধ প্রশস্তকরণ (মাটির কাজ): ১৪,১০,৭৮৩ ঘনমিটার

পেভমেন্ট প্রশস্তকরণ ও মজবুতীকরণ (৫.৫০ মি. থেকে ১০.৩০ মি.): ৪৪.৩৯ কিমি.

সার্ফেসিং ও ডিবিএস কাজ : ৪৮.০৫ কিমি.

রিজিড (আরসিসি) পেভমেন্ট নির্মাণ : ১০.১৫ কিমি.

বাস-বে নির্মাণ (৩০টি): ৪.৫০ কিমি.

অন্যান্য অবকাঠামো : ৭৮টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ (৫০৩ মিটার), ১৩টি কালভার্ট প্রশস্তকরণ, ৯,৯৯০ মিটার আরসিসি ইউ-ড্রেন, ১৫,০০০ মিটার সসার ড্রেন এবং ১২,০০০ বর্গমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ।

দ্বিতীয় প্রকল্প : কর্ণফুলী টানেল থেকে চন্দনাইশ গাছবাড়িয়া সংযোগ সড়ক

কর্ণফুলী টানেল থেকে চন্দনাইশ গাছবাড়িয়া (কালাবিবির দীঘি থেকে গাছবাড়িয়া) পর্যন্ত ২১.০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি স্ট্যান্ডার্ড দুই লেনে উন্নীতকরণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বর্তমানে এই প্রকল্পের দুইটি প্যাকেজের দরপত্র মূল্যায়ন কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যেই নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর থেকে কক্সবাজারমুখী যানবাহনগুলোকে আনোয়ারা চাতুরী, শিকলবাহা ওয়াই-জংশন, শান্তিরহাট ও পটিয়া বাইপাস হয়ে ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাড়িগুলো কর্ণফুলী টানেল হয়ে কালাবিবির দীঘি ও সৈয়দকুচিয়ার মোড় দিয়ে মাত্র ২১.০৮ কিলোমিটারে গাছবাড়িয়া পৌঁছবে। ফলে সরাসরি ১৮ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে এবং যাতায়াতে প্রায় ৩৫ মিনিট সময় সাশ্রয় হবে।

সড়কটি এন-১ (ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার) জাতীয় মহাসড়ক এবং আর-১৭০ (পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী) আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। এর ফলে আনোয়ারা ও চন্দনাইশ উপজেলা সরাসরি টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহর, পার্বত্য বান্দরবান ও পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে যুক্ত হবে।

সওজ চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, এই সংযোগ সড়ক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ভূমিকা রাখবে। আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার কৃষিজপণ্য, সামুদ্রিক মাছ এবং বিভিন্ন মৌসুমী ফল দ্রুত ও কম খরচে দেশের নানা প্রান্তে পাঠানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া এটি কক্সবাজারগামী যানবাহনের জন্য একটি দ্রুতগতির বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে, যা দুই উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।