মার্কিন-ইরান চুক্তি হচ্ছে না আজ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • উত্তেজনা প্রশমনে ইরানের জব্দ সম্পদ ফেরত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-আমিরাত
  • আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্নের ইঙ্গিত ইরানি মুখপাত্রের
  • পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না : পাকিস্তান

দীর্ঘদিন ধরে চলমান সামরিক সঙ্ঘাতের অবসান ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, উভয়পক্ষ খসড়া চুক্তির ভাষা ও রূপরেখায় একমত হয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তিটি ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আজ রোববারে চুক্তি সই না হলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে।

প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, ইরান কর্তৃক অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়া হবে এবং ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন জনসমক্ষে স্বীকার না করলেও ইরানের জব্দ করা ২৪ বিলিয়ন ডলার ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে ইরানকে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। চুক্তিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তি : পাকিস্তান : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (টুইটার) দেয়া এক পোস্টে অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আমরা শান্তি চুক্তির আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খুব কাছাকাছি রয়েছি। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে এই ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্থায়ী শান্তির জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।’ তিনি জানান, চুক্তিটি ইলেকট্রনিক উপায়ে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর আগামী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এই শান্তি প্রক্রিয়াটি সফল করতে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সমর্থন দেয়ার জন্য তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানান। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, চলমান এই শান্তি আলোচনা মূলত যুদ্ধ বন্ধের ওপর কেন্দ্রীভূত এবং এ মুহূর্তে বিতর্কিত পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না, যা পরে আলোচনার টেবিলে আসবে।

২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ে সম্মতি ট্রাম্পের

এ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাঝেই বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন ইরানের নীতিনির্ধারণী পরিষদের সদস্য মোহসেন রেজাই। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জব্দ করা ২৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থ ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছেন, তবে রাজনৈতিক কারণে জনসমক্ষে তা স্বীকার করতে চাইছেন না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যে সরাসরি ঘোষণা করেছেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে এবং এই প্রাথমিক সমঝোতা প্রমাণ করে যে চলতি সঙ্ঘাত থেকে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।’

মোহসেন রেজাই মার্কিন প্রশাসনকে ইসরাইলের একটি ‘উপনিবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ট্রাম্পের মতো জুয়াড়ি নেতারাও এখন ইরানের সামরিক সক্ষমতার কারণে সরাসরি সঙ্ঘাত বা আলোচনা করতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, ইরানই বিশ্বের প্রথম দেশ যারা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫, এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ও অ্যাওয়াক্স নজরদারি বিমান ধ্বংস করে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। এই লড়াইয়ে রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) উদ্ভাবিত ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ মার্কিন কোটি ডলারের বিমানবাহী রণতরী ও ক্ষেপণাস্ত্রকে অসহায় করে তুলেছে। মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন এবং স্বল্পমূল্যের দ্রুতগামী স্পিডবোট দিয়েই মার্কিন দাপট রুখে দেয়া হয়েছে।

আমিরাতের বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে চারজন আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের অবরুদ্ধ ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুবাইয়ের পর্যটন খাত এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক হাব হিসেবে আমিরাতের সুনামে বড় ধাক্কা লেগেছিল। তবে গত ৪ মে ওমান উপসাগরে আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে সর্বশেষ হামলার পর গত এক মাসে দেশটি নতুন কোনো আক্রমণের শিকার হয়নি; বরং ইরান এখন কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা তাক করেছে।

সূত্রমতে, গত সপ্তাহে ইরানের শক্তিশালী আইআরজিসি কর্মকর্তারা আবুধাবিতে আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের গেস্ট হাউসে এক গোপন বৈঠক করার পর এই আর্থিক সমঝোতা দ্রুত গতি পায়। এর বিনিময়ে আমিরাতকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরোপুরি বন্ধ করার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পুনর্গঠন করা হবে। ইতোমধ্যে প্রথম কিস্তির ৩ বিলিয়ন ডলার তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই আর্থিক লেনদেনের খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্য দিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন, কেবল চুক্তিতে সই বা বৈঠকে বসার জন্য ইরানকে কোনো অর্থ দেয়া হবে না; বরং চুক্তির শর্ত পূরণ করলেই তেহরান অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।

তেহরানে রুশ-চীন তৎপরতা

চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খসড়া প্রস্তাবের সবশেষ অগ্রগতি নিয়ে তেহরানে রুশ ও চীনা রাষ্ট্রদূতদের সাথে বিশেষ বৈঠক করেছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি। দেশটির স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ) নিশ্চিত করেছে, বৈঠকে ইসলামাবাদে খসড়া সমঝোতা স্মারক সম্পর্কিত সবশেষ অগ্রগতি নিয়ে তিন দেশের মধ্যে গভীর মতামত বিনিময় ও রণকৌশল আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরান নিজের অবস্থানে অনড় ও অবিচল থাকবে।’ তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নিশানা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের তীব্র সমালোচনা করেন।

মার্কিনিদের ‘একদমই বিশ্বাস করি না’

সমঝোতা এগিয়ে চললেও ওয়াশিংটনের প্রতি চরম অনাস্থা প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি-এজেই। আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, আমরা আমেরিকানদের একদমই বিশ্বাস করি না। এই অবিশ্বাস কেবল আবেগের বিষয় নয়; বরং এটি ইতিহাসের নানা ঘটনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তিনি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ওই সঙ্ঘাত প্রমাণ করেছে ইরান শত্রুদের নেতৃত্বকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করতে এবং আগ্রাসীদের হাত গুটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

সমঝোতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরাইল

এ দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আসন্ন এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইসরাইল অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল এমন কোনো চুক্তিতে আগ্রহী নয়, যা যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। কারণ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কৌশলগত লক্ষ্য ছিল ইরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। এ ছাড়া লেবানন সীমান্ত এবং উত্তর ইসরাইলে হিজবুল্লাহর অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ওই অঞ্চলের ইসরাইলি বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে, তাই তিনি যুদ্ধবিরতি ঠেকিয়ে মাঠপর্যায়ে যতটা সম্ভব সামরিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন।

হরমুজ প্রণালীতে শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা

চুক্তির খবর আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালীর কাছে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালীর দিকে যাওয়া ইরানের কয়েকটি ‘ওয়ান-ওয়ে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল। এ ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে টুইট করেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো থেকে ইরানের বিরত থাকা উচিত এবং তেহরানের উচিত খুব দ্রুত নিজেদের শুধরে নেয়া।

অন্য দিকে ইরানের সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের সিরিক বন্দর ও কেশম দ্বীপে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌ শাখার অনুমতি ছাড়া কিছু বিদেশী জাহাজ জলপথটি পার হওয়ার চেষ্টা করায় তাদের সতর্ক করতে গুলি ছোড়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী ইরান ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে। পশ্চিমা ও পাকিস্তানি সূত্রে জানা গেছে, ফাঁস হওয়া খসড়া প্রস্তাবের অধিকাংশ শর্তই ইরানের পক্ষে গেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু হরমুজ প্রণালী আবার খোলার বিষয়টি ছাড়া বড় কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাননি। এ কারণেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই খসড়া প্রতিবেদনের কিছু শর্তকে ভুল উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করছেন।