১৩ বছরেও সন্ধান মেলেনি গুম হওয়া বিএনপি নেতা হিরু-পারভেজের

Printed Edition

হাবিবুর রহমান চৌধুরী, কুমিল্লা

প্রায় ১৩ বছর আগে কুমিল্লা থেকে র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর ‘নিখোঁজ’ হন লাকসাম উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু এবং লাকসাম পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি হুমায়ূন কবীর পারভেজ। দীর্ঘ ১৩ বছরেও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। তারা বেচে আছেন, নাকি মারা গেছেন- এমন তথ্যও জানে না দুই পরিবার।

হুমায়ূন কবীর পারভেজের ছোট ভাই ও মামলার বাদি গোলাম ফারুক গতকাল রোববার বলেন, ‘আমরা এখনো আশাবাদী, আমাদের গুম হওয়া স্বজনদের ফিরে পাব।’

পরিবার ও মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে কুমিল্লার হরিশ্চর এলাকায় ঢাকাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে র‌্যাব সদস্যরা সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু, বিএনপি নেতা হুমায়ূন কবীর পারভেজ এবং পৌর বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিনকে তুলে নিয়ে যান। পরে জসিম উদ্দিনকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় অন্য একটি মাইক্রোবাসে তুলে দেয়া হয়। তবে হিরু ও পারভেজকে কোনো থানায় হাজির করা হয়নি। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ রয়েছেন।

এ ঘটনায় থানায় মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে ২০১৪ সালের ১৮ মে হুমায়ূন কবীর পারভেজের বাবা রংগু মিয়া কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলায় র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাহেদ রাজী, ডিএডি শাহজাহান আলী, এসআই সুলতান আহমেদ ও অসিত কুমারকে আসামি করা হয়।

মামলার বাদি রংগু মিয়া ওই বছরের ৩১ আগস্ট মারা যান। পরে ১৫ অক্টোবর তার ছেলে এবং হুমায়ূন কবীর পারভেজের ছোট ভাই গোলাম ফারুককে মামলার বাদি করা হয়। ২০১৫ সালে মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে র‌্যাবের মাধ্যমে হিরু ও পারভেজকে ‘অপহরণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি’ বলে উল্লেখ করা হয়। একই সাথে তারা স্বেচ্ছায় ‘আত্মগোপনে’ থাকতে পারেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে পরিবারের সদস্যরা সেই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ দুই নেতার সন্ধানের দাবি জানিয়ে আসছেন।

সাইফুল ইসলাম হিরুর একমাত্র ছেলে রাফসানুল ইসলাম বলেন, ‘বাবার খোঁজে অনেকের দ্বারস্থ হয়েছি। লাকসাম থানায় মামলা নিতে চাওয়া হলেও মামলা নেয়া হয়নি। পরে কোনো উপায় না পেয়ে বাবা হারিয়ে গেছেন এই মর্মে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। এরপর র‌্যাব-১১-এর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে যাই। র‌্যাব সেদিন অভিযান চালালেও আমার বাবাকে আটক করেনি বলে জানানো হয়।’

তিনি বলেন, ‘এরপর যেখানেই বাবার খোঁজ আছে বলে শুনেছি, সেখানেই ছুটে গেছি। এখনো বাবাকে খুঁজছি। আমরা ডিজিএফআইয়ের সাথেও দেখা করেছি। তারা প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য-প্রমাণ চেয়েছিল, আমরা সেগুলো দিয়েছি। আশা করি, বাবাকে ফিরে পাব।’

গোলাম ফারুক বলেন, ২০২৫ সালে গুমের অভিযোগে সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও কুমিল্লা-৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো: তাজুল ইসলামসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও গুম কমিশনে অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

অভিযোগে তাজুল ইসলামের পাশাপাশি র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন কুমিল্লা ক্যাম্পের কোম্পানি-২-এর দায়িত্বে থাকা মেজর শাহেদ হাসান রাজীব, ডিএডি মো: শাহজাহান আলী, এসআই কাজী সুলতান আহমেদ, অসিত কুমার রায় এবং লাকসাম থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়েরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আইনজীবী বদিউল আলম সুজন বলেন, ‘এই মামলায় দুইজন আসামিকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। দুই বিএনপি নেতাকে গুমের পর প্রথমে থানায় জিডি এবং পরে আদালতে মামলা করা হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একবারও কোনো তদন্ত সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।’

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে নিখোঁজ দুই নেতার পরিবারের সদস্যরা এখনো তাদের স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন।