একঘরে হয়ে পড়েছেন ইনফান্তিনো

উয়েফা পর কনকাকাফ ও এএফসির বিরোধিতা

Printed Edition
একঘরে হয়ে পড়েছেন ইনফান্তিনো
একঘরে হয়ে পড়েছেন ইনফান্তিনো

ক্রীড়া ডেস্ক

ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কাঠামোয় সম্ভাব্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ফিফা। বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় টুর্নামেন্টের মালিকানার অংশীদারত্ব (শেয়ার) বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয়ের যে পরিকল্পনা জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফা করেছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপের সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সেই ধারায় গত পরশু একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ফিফা আয়োজিত সব টুর্নামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ। তার সাথে যোগ দিয়েছে কনকাকাফ ও এএফসি। বিষয়টি ইতোমধ্যে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলে। এতে ব্যর্থ ও একঘরে হয়ে পড়েছেন ইনফান্তিনো। তবে এবার মুখ খুলেছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ফিফা)। ফিফা বলল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না। এমন চিন্তাভাবনা কখনো প্রশ্রয় দেবে না’। ফিফা এ বিষয়ে আলোচনা ও পরামর্শ-প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

উয়েফার সভা শেষে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘উয়েফা ও এর সদস্য জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে না।’ যদি ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাহলেই উয়েফার টুর্নামেন্ট বর্জনের হুমকি কার্যকর হবে। উদ্ভূত সঙ্কটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বকাপসহ ফিফা আয়োজিত আসন্ন টুর্নামেন্টগুলোতে দেখা যাবে না ইউরোপের দলগুলোকে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারাই এই বিষয়টির সাথে জড়িত, তাদের কেউই নিশ্চিত নয় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।

পোল্যান্ডে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ। যেখানে ইউরোপের একাধিক দেশের অংশগ্রহণ করার কথা। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ওই টুর্নামেন্টে কতটা পড়বে- এ বিষয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছেন, ‘(উয়েফার সভায়) সামগ্রিক এই নীতিনির্ধারণের সময় হয়তো এত বিস্তারিত বা খুঁটিনাটি বিষয় ভাবা হয়নি।’

ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন ফিফার এই পরিকল্পনায় সমর্থন দিলে আগামী চার বছরের চক্রে ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি পাবে চার কোটি ডলার। তবে এই সুবিধা পেতে হলে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সদস্যদেরকে সম্মতি জানানোর সময় বেঁধে দিয়েছে সংস্থাটি। ফলে তাত্ত্বিকভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, ইউরোপের দলগুলো হয়তো নারী অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার সময় কিংবা সেমিফাইনালের ঠিক আগেই টুর্নামেন্ট থেকে নাম তুলে নিতে পারে।

উয়েফার পর ফিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে কনক্যাকাফও। উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার ৪১টি সদস্য দেশই বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অংশীদারত্ব বিক্রির জন্য দেয়া ফিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এক বিবৃতিতে গত পরশু এই তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।

কনকাকাফ উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপের তিন স্বাগতিক দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাও এর সদস্য। আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যানের আগেই গত পরশু কনক্যাকাফ জানিয়েছিল, প্রস্তাবটি দেয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।

ফিফার এই ‘বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির উদ্যোগের বিরোধিতা করে কনকাকাফের পর এবার যোগ দিলো এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও (এএফসি)। এএফসি গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়ে জানিয়েছে, উয়েফা ও কনকাকাফের পাশে আছে তারা।

তবে ইউরোপের মতো সরাসরি বয়কটের হুমকি দেয়নি এশিয়া। উয়েফার সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন পরিকল্পনা প্রত্যাহার না হলে ফিফার সব আয়োজন বয়কট করবে তারা। উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সংস্থা কনকাক্যাফও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। এএফসি তাদের বিবৃতিতে লিখেছে, ‘বিশ্বকাপ বর্জনের বাস্তব সম্ভাবনা যে জনসমক্ষে আলোচিত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা প্রত্যেকের জন্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।’ ‘ফুটবলের কখনোই এমন অবস্থানে পৌঁছানো উচিত ছিল না’ বলে উল্লেখ করেছে এএফসি।

এই টানাপড়েনের মধ্যেই এলো আরেকটি ধাক্কা। ফিফা প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরোও গতকাল এই বিক্রয় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। সাবেক ব্যাংকার ও যুক্তরাষ্ট্র সকার ফেডারেশনের সাবেক সহসভাপতি কর্দেইরোকে একসময় ইনফান্তিনো নিজে বেছে নিয়েছিলেন বিশ্ব ফুটবলের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য। সেই মানুষটিই এখন বলছেন, তিনি ‘চুপ করে বসে থাকতে পারেন না, যখন ফিফা বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির কথা ভাবছে।’

৯৬টি দেশ বিপক্ষে দাঁড়ানোর পর ফিফা বলল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না। ফিফা এমন চিন্তাভাবনা কখনো প্রশ্রয় দেবে না’। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা গতকাল বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে আলোচনা ও পরামর্শ-প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

ফিফার পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘গণমাধ্যমের কিছু ভুল প্রতিবেদনের কারণে আমাদের পূর্বপরিকল্পিত আলোচনা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে তথ্য ও সত্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন যেন তাদের মতামত বা ভোট প্রদান করতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই আমরা এ আলোচনা-প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবো।’

ফিফার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘জনসমক্ষে উঠে আসা বিভিন্ন পরামর্শ, মতামত ও উদ্বেগকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রতি আমাদের যে প্রতিশ্রুতি, আমরা তা পুনর্র্ব্যক্ত করছি।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘প্রতিটি সদস্য দেশ যেন নিজ নিজ অঞ্চলে ফুটবলের বড় বাণিজ্যিক সুযোগগুলোর অংশীদার হতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই কেবল এফএফই গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এর ফলে ফিফা কিংবা ফুটবলের নিজস্ব চেতনা ও পরিচালনানীতিতে কোনো আঘাত আসবে না।’