নিজস্ব প্রতিবেদক
আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী মধ্যস্থতার বা ‘প্রি-কেস মেডিয়েশন’ উদ্যোগ নেয়ার পর বিচারপ্রার্থীদের মামলা দায়েরের হার গড়ে ৬২ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং আদালতে নতুন মামলা দায়ের উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। এই উদ্যোগকে আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে।
গতকাল মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় আদালতে সরাসরি মামলা দায়েরের আগেই নিজেদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে বিচারপ্রার্থীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। একটি পাইলট প্রকল্পের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। এর মধ্যে পারিবারিক আদালত আইনে মামলা তিন হাজার ৫৫৯টি থেকে কমে এক হাজার ৭৪৪টিতে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ হ্রাস। সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টন সংক্রান্ত মামলা দুই হাজার একটি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬১টিতে, যা ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
পরিসংখ্যানের বিস্তারিত তুলে ধরে মন্ত্রী আরো জানান, স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলা ১৭টি থেকে কমে দু’টিতে নেমেছে, যা ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস। নন-অ্যাগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনে মামলা ৩১টি থেকে কমে ১৪টিতে নেমেছে (৫৪.৮৪ শতাংশ হ্রাস), যৌতুক নিরোধ আইনে পাঁচ হাজার ৬০৫টি থেকে কমে এক হাজার ৮১০টিতে নেমে এসেছে (৬৭.৭১ শতাংশ হ্রাস) এবং পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনে ৪৩টি থেকে কমে ৩৫টিতে নেমে এসেছে (১৮.৬০ শতাংশ হ্রাস)। সব মিলিয়ে পাইলট এলাকাগুলোতে গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ মামলা দায়ের হ্রাস পেয়েছে। আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এই প্রক্রিয়ায় আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
মধ্যস্থতাকারীদের সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, এই দায়িত্বকে কেবল চাকরি হিসেবে নয়, বরং জনসেবামূলক একটি দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মধ্যস্থতা কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ থাকবে বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
বক্তব্য শেষে আইনমন্ত্রী আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ২১খ ধারার বিধান অনুযায়ী নতুন ১০টি জেলায় একযোগে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জেলাগুলো হলো- বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল। এখন থেকে উল্লিখিত জেলাগুলোতে নির্দিষ্ট সাতটি আইনের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের পূর্বে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা, জিআইজেড এবং ইউএনডিপি সহযোগিতা প্রদান করছে।



