নিজস্ব প্রতিবেদক
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, “গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। এ আয়না যত নিখুঁত হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তব চিত্রও তত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।” গতকাল রাজধানীর সার্কিট হাউজ রোডের তথ্য ভবনের ডিএফপি সম্মেলন কক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘১৬ জুন বাকশালী শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস’ স্মরণে এবং ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ও এনইসির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ কামাল খান সোহেল। সঞ্চালনা করেন যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার।
অংশীজনদের ঐকমত্যের ওপর জোর
তথ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগ ছিল আংশিক ও অসম্পূর্ণ। কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি না হওয়ায় বাংলাদেশে গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যের ‘অফকম’ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’-এর আদলে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হলে তা পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। এই কমিশন একদিকে যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, অন্য দিকে স্বাধীনতার অপব্যবহার ও নৈরাজ্য রোধে দায়িত্বশীলতার সীমারেখাও নির্ধারণ করবে।”
তিনি আরো জানান, একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বজনগ্রাহ্য কমিশন গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সম্পাদক কাউন্সিল, সংবাদপত্র মালিক সমিতি, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ সব পক্ষের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে এবং শিগগিরই তাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। লক্ষ্য ও মতামতের ক্ষেত্রে ঐক্য না থাকলে অতীতের মতো এবারো উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। একজন সাবেক বিজ্ঞ বিচারপতির নেতৃত্বে এই কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে তথ্য ও আইন মন্ত্রণালয়, সম্পাদক কাউন্সিল, ট্রেড ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধিরা থাকতে পারেন।
কণ্ঠরোধমুক্ত প্রকৃত স্বাধীনতার দাবি মাহমুদুর রহমানের
সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র বিলুপ্তির মাধ্যমে যে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারও ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছিল।
তিনি বলেন, “আমরা মিডিয়াকে কোটারিমুক্ত করে একটি জাতীয় চরিত্র দিতে চাই। মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা মানে হলো- আমি আমার মত প্রকাশ করতে পারব। আপনার পছন্দ না হলে আপনি লিখে প্রতিবাদ করবেন, কিন্তু আমার কণ্ঠরোধ করতে পারবেন না। এই মৌলিক ইস্যুতে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
তিনি বিগত সরকারের আমলে প্রেস কাউন্সিলের বিতর্কিত নিয়োগের সমালোচনা করে সরকারের বর্তমান সব গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যারা বিগত ফ্যাসিবাদের সহযোগী হয়ে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গণহত্যাকে গণমাধ্যমে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে, তাদের সাথে কোনো আপস বা ঐক্যের সুযোগ নেই; তাদের বিচার ফৌজদারি আইনেই হতে হবে।
সেমিনারে অন্য বক্তাদের অভিমত
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধকার মারুফ কামাল খান বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন বাকশাল গঠনের পর মাত্র চারটি সরকারি পত্রিকা রেখে দেশের সব সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছিল, যা ছিল সাংবাদিকতার অপমৃত্যু। পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন।
অন্য বক্তারাও বিগত ১৬ বছরের বৈষম্য ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, “সারা দেশের সম্পাদকদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এনইসি গঠিত হয়েছে। তিনি বিগত ১৬ বছর ধরে নয়া দিগন্তসহ যেসব গণমাধ্যম বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তা দূর করতে তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।”
জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ : বলেন, “শেখ মুজিবের অত্যাচারের কাল এবং শেখ হাসিনার ডিজিটাল নির্যাতনের সময়কাল নিয়ে গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।” তিনি দৈনিক বাংলাসহ প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকাগুলো পুনঃপ্রকাশের দাবি জানান।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও ওয়াদা সম্পাদক, শফিকুল আলম বলেন, “বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে ৬০ লাখের বেশি মামলা, ব্যাংক ডাকাতিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করা হয়নি। আমরা বিরুদ্ধমত নিয়ে চলতে চাই, তবে কেউ যেন পুনরায় ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ না করেন।”
বিএফইউজে সভাপতি, ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন : “সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে কখনো গণতন্ত্র কায়েম করা যায় না। বর্তমান সরকার যেন বিভিন্ন তালিকা তৈরির নামে সেই পুরনো পথে পা না বাড়ায়।”
মহাসচিব, বিএফইউজে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, “বিগত সময়ে কিছু সম্পাদক ফ্যাসিবাদীদের সমর্থন জুগিয়েছেন। যারা ছাত্রহত্যার উসকানিদাতা, তাদের কোনো ছাড় বা আপসের সুযোগ নেই।”
ডিইউজে, সভাপতি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক, শহীদুল ইসলাম বলেন, “আওয়ামী আমলে প্রতিদিনই ছিল কালো দিন। সে সময় শীর্ষ সাংবাদিকদের ওপর জেল-জুলুম হলেও অনেক সম্পাদক তার প্রতিবাদ না করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন।”
ডিআরইউ সভাপতি, আবু সালেহ আকন বলেন : “সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত না হওয়ার কারণে তারা সাহসী হতে পারছেন না।” তিনি সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন, অবসরভাতা ও বেকারভাতা চালুর দাবি জানান।
সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, বাংলাদেশের খবর সম্পাদক সৈয়দ মেসবাহউদ্দিন, পিআইবি চেয়ারম্যান ফারুক ওয়াসিফ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি রাশেদুল ইসলাম, নিউ টাইমস সম্পাদক সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।



