মোদির বাসভবন ঘিরে কংগ্রেসের অবস্থান, আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশি অভিযানের পর চাপে বিজেপি সরকার

Printed Edition
দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে থেকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে গ্রেফতার করে পুলিশ  : ইন্টারনেট
দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে থেকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে গ্রেফতার করে পুলিশ : ইন্টারনেট

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে নামে কংগ্রেস। বিক্ষোভ থেকে রাহুল গান্ধীকে আটক করে পুলিশ; সরিয়ে নেয়ার সময় তার নাক থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। এ ছাড়া প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রদান আখিলেশসহ বিরোধী জোটের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ।

এ দিকে ভারতের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্ন ফাঁস এবং ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। গত সোমবার ছাত্রদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনার গতকাল নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে কংগ্রেস। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

বিকেলে কংগ্রেস সভাপতির সরকারি বাসভবন থেকে পদযাত্রা শুরু করে নেতাকর্মীরা লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে রাহুল গান্ধী সড়কে অবস্থান নিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবসহ অন্য নেতাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। কংগ্রেসের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

বিক্ষোভ শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় রাহুল গান্ধী বলেন, ছাত্রদের ওপর হামলা মানে ভারতের প্রতিটি পরিবারের ওপর হামলা। তিনি দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। আরেক পোস্টে তিনি বলেন, ছাত্রদের ওপর পুলিশের কঠোর অভিযানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং সরকারের দায়িত্ব নির্ধারণের দাবিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গেছেন। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগও দাবি করেন।

কংগ্রেসের এই কর্মসূচির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং বিক্ষোভস্থলে গিয়ে রাহুল গান্ধীর সাথে কয়েক মিনিট কথা বলেন। তবে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সৈয়দ নাসির হুসেইন বলেন, সরকার বিক্ষোভ প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেও তাদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়ায় তা মানা হয়নি। তাদের প্রধান দাবি- কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা।

অন্য দিকে জিতেন্দ্র সিং দাবি করেন, প্রথমে রাহুল গান্ধী কেবল সংসদে আলোচনা চেয়েছিলেন। পরে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও যুক্ত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আলোচনার ভিত্তি পরিবর্তন করায় সমঝোতার সুযোগ নষ্ট হয়েছে। এ দিকে গতকালের সংসদ অধিবেশনেও প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ছাত্র বিক্ষোভের বিষয়টি উত্থাপনের চেষ্টা করে বিরোধীরা। তবে কার্যক্রম বারবার মুলতবি হওয়ায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি বলে অভিযোগ কংগ্রেসের। সংসদ ভবনের বাইরে মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ছাত্রদের ওপর হামলার বিষয়ে তারা সংসদে কথা বলতে চাইলেও সুযোগ দেয়া হয়নি।

বিক্ষোভের পটভূমিতে রয়েছে গত সোমবারের ছাত্র আন্দোলন। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি যুব সংগঠনের নেতৃত্বে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়। সংগঠনটির দাবি, ওই অভিযানে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন। তবে দিল্লি পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা পাথর নিক্ষেপ, সরকারি যানবাহন ভাঙচুর এবং সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং ৭০ জনকে আটক করা হয়।

এই আন্দোলনের পেছনে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠেন শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে প্রায় ২০ দিন অনশন পালন করেন। গত ১৮ জুলাই দিল্লি পুলিশ তাকে জোর করে আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তর থেকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার পরিবার ও আন্দোলনকারীরা এটিকে ‘অবৈধ আটক’ বলে অভিযোগ করেন।

ওয়াংচুককে সরিয়ে নেয়ার ঘটনার পরই আন্দোলন আরো বেগ পায়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার ডাক দেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজারো মানুষ দিল্লিতে সমবেত হন।

এ দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) সংসদীয় দলের বৈঠকে বলেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা রোধ করা জাতীয় দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর প্রকাশের পর সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ দিকে ছাত্র সংগঠনটি ঘোষণা দিয়েছে, পুলিশের কঠোর অভিযানের পরও তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

ভারতের তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) একটি যুব-প্রধান প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা বিজেপির প্রতি জনগণের ক্ষোভের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও বর্তমানে সিজেপি রাজপথে এক বিশাল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি তুলেছে শিক্ষার্থীরা কারণ পরীক্ষা ব্যবস্থায় পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল ও পুনর্নির্ধারণ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া এই প্রতিবাদে ভারতের সব স্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন। প্রতিবাদকারীরা যন্তর মন্তরেই তাদের ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছেন, যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার সরবরাহ করছেন এবং সাধারণ মানুষ তাদের সমর্থনে সংবিধানের অনুলিপি ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার নিয়ে আসছেন।

অন্য দিকে বিজেপি সরকার এই আন্দোলনকে ইতিবাচকভাবে দেখার পরিবর্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রতিবাদকারীদের ‘সন্ত্রাসীদের বি টিম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্দোলন দমনে পুলিশি তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো; পুরো প্রতিবাদ এলাকা সিসিটিভি ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

গত ১৮ জুলাই জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিযানে প্রায় এক লাখ মানুষ অংশ নেন। পুলিশ এই মিছিলে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে, অনেক প্রতিবাদকারী আহত হন।

উত্তর ভারতের উত্তরপ্রদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপিকা ইন্দ্রিজা সিং, দিল্লি থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তার বাড়ি এলাহাবাদ থেকে যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর জন্য একটি রাতভর ট্রেনে যাত্রা করেন। ৬৫ বছর বয়সী সিং ব্যাখ্যা করেন, একজন অধ্যাপিকা হিসেবে যিনি তরুণ মনকে শক্তিশালী করার জন্য কয়েক দশক বিনিয়োগ করেছেন, বিজেপির এই কর্মকাণ্ডকে তার কাছে প্রতারণা বলে মনে হয়েছে। এটি সব স্তরেই অনৈতিক। গত দশকে সরকারের কর্মকাণ্ড নাগরিকদের সাথে তাদের আচরণের ওপর আমাদের বিশ্বাসকে ক্ষুণœ করেছে। ছাত্রছাত্রীরা যেকোনো দেশের ভবিষ্যৎ এবং বিজেপি এই ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের অবশ্যই নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করতে হবে।

সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, সবচেয়ে হাস্যকর যে সরকার সংলাপে বিশ্বাস করে না, তারা শুধু নাগরিকদের হয়রানি, জেলে পাঠানো এবং তাদের অধিকার হরণ করতে বিশ্বাস করে। লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে, কিন্তু তাদের [বিজেপির] কাছে ছাত্রছাত্রী, তাদের স্থবির জীবন এবং বেদনাদায়ক আত্মহত্যা কোনো ব্যাপারই না।

ঘেরাও, অপহরণ ও দমন

১৮ জুলাই ভোরে, সাদা পোশাকে থাকা দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তারা যন্তর মন্তরে ঢুকে আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে প্রতিবাদস্থল থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেন। ৫৯ বছর বয়সী জলবায়ু কর্মী ও শিক্ষাবিদ ওয়াংচুক, যিনি তেলাপোকাদের সমর্থনে ২৮ জুন অনশন শুরু করেছিলেন, তাকে প্রতিবাদস্থল থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই জোরপূর্বক অপসারণের পর, বেশ কয়েকজন ভারতীয় জন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রতিবাদস্থলে যান, যা এই আন্দোলনের প্রতি পূর্বে অনুপস্থিত সমর্থন প্রদর্শন করে।

জবাবদিহিতার দাবিতে আন্দোলন শুরু হওয়ার দুই মাস পর, তেলাপোকাটি এখন শুধু অবজ্ঞার প্রতীকের চেয়েও বড় কিছুতে পরিণত হয়েছে। তেলাপোকাটি এখন এমন এক আন্দোলনের প্রতীক, যা কঠিন প্রশ্ন তুলছে এমন এক যুগে, যেখানে মোদি সরকারের ব্যর্থতা দিন দিন দ্বিগুণ হচ্ছে। গত সপ্তাহে নাগপুর, ভুবনেশ্বর ও ব্যাঙ্গালোরের মতো ভারতের বিভিন্ন শহরেও সিজেপির সমর্থনে বিক্ষোভ দেখা গেছে। এসব বিক্ষোভে শিক্ষা খাতের অবক্ষয়, ছাত্রছাত্রীদের মৃত্যু, সরকারের জবাবদিহিতার অভাব এবং প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে জবাবদিহিতার দাবি জানানো হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদির তৃতীয় মেয়াদে, তেলাপোকারাও তাকে সংসদ থেকে দূরে সরিয়ে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, যেগুলোতে তিনি গত ১২ বছর ধরে কঠোর নীরবতা বজায় রেখেছেন।