মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। এই বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বরাবরই একটু বেশি থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো- সবমিলিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের চাওয়া জীবনযাত্রায় স্বস্তি।
বাজেটে প্রত্যাশা কী এমন প্রশ্নের উত্তরে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী জুয়েল রানা এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি তার পড়াশোনার খরচ নিয়ে চিন্তিত। একই সাথে আসন্ন বাজেটে তেল, চাল ও ডালসহ সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যের দাম সহনীয় থাকবে, এমটাই প্রত্যাশা তার। তবে বাজেটটাকে আরো সুনির্দিষ্ট কিছু খাতে বাড়িয়ে বা কমিয়ে বাংলাদেশটাকে আরো উন্নত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
কাঁচাবাজারের বিভিন্ন পণ্যের ওপর দাম কমানো জরুরি বলে জানান মধ্যবয়সী এক ভোক্তা। বাজেটে প্রত্যাশা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মধ্যবয়সী এক নারী বলেন, সাধারণ মানুষ সত্যি খুবই হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমান যুগে যা টাকা পায় সেটা দিয়ে তার চলে না।
নয়া দিগন্তের এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় একাধিক শ্রমজীবী মানুষের। তাদের অধিকাংশেরই জাতীয় বাজেট নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। তাদের প্রধান চিন্তা সংসার চালানো আর নিত্যপণ্যের দাম। জাতীয় সংসদে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা হয়। বাজেট নিয়ে চলে রাজনৈতিক বিতর্ক, অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ এবং নানা মহলের আলোচনা। কিন্তু এই আলোচনার বাইরেই থেকে যান একদল মানুষ। তারা শ্রমজীবী, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। বাজেটের অঙ্ক, রাজস্ব ঘাটতি কিংবা প্রবৃদ্ধির হিসাব তাদের কাছে খুব একটা অর্থ বহন করে না। তাদের একমাত্র প্রশ্ন বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ আর সবজির দাম কত?
রাজধানীর কৃষি মার্কেটে কথা হয় রিকশাচালক ওহাব মিয়ার সাথে। বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, বাজেটে কী আছে, কী নাই, এগুলো বুঝি না। সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চালাতে পারলেই হলো। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমলে আমাদের লাভ।
একই ধরনের কথা বলেন ডাব বিক্রেতা ইউনুস আলী। তিনি বলেন, মোবাইলে বাজেটের খবর দেখি, কিন্তু কিছুই বুঝি না। আমরা শুধু চাই নিত্যপণ্যের দাম কমুক। বাজারে গেলে যেন কম টাকায় জিনিস কিনতে পারি। কয়টা ডাল ভাত খেয়ে বাঁচতে পারলেই হলো।
রাজধানীর কাওরান বাজারে ভ্যানচালক সেলিম বলেন, চাল কিনতে গেলে দাম বেশি, তেল কিনতে গেলে দাম বেশি, ডাল কিনতে গেলে দাম বেশি। বাজেটে যদি এসবের দাম কমে, তাহলে ভালো। তবে সেই আশা করছি না। আমাদের কষ্টের জীবন কখনোই শেষ হবে না।
মোহাম্মদপুর টাউন হলে জামা সেলাই করছিলেন হেলাল উদ্দিন। বাজেট ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে বড়লোকরা কথা বলে। আমরা শুধু দেখি বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমল কি না। সকালে যা আয় করি, সন্ধ্যায় তা দিয়ে সংসার চলে কি না, এটাই চিন্তা।
বাজেটে অর্থনীতির নানা সূচক উন্নতির কথা বলা হলেও শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশের কাছে জীবন এখনও সংগ্রামের। তাদের অনেকেই জানেন না বাজেটে কী থাকে, কীভাবে তা তাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাজেটের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি সহনীয় থাকে, তাহলে বাজেট ভালো। আর যদি সংসারের খরচ বাড়তেই থাকে, তাহলে বাজেটের বড় বড় ঘোষণাও তাদের কাছে গুরুত্ব হারায়।
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বাজেটের হিসাব বড়ই জটিল বিষয়, করনীতি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা নির্ধারিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বাজেট ঘোষণার পর যদি দ্রব্যমূল্য কমে, তারা স্বস্তি পায়। আর দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার সঙ্কট আরো গভীর হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ডিজিটাল সেবায়ও বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু একই সাথে বেড়েছে আয়বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক অনিশ্চয়তা। দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই বাস্তবতায় একটি জনবান্ধব বাজেটের প্রথম শর্ত হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা। মূল্যস্ফীতির সাথে মানুষের আয় যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে উন্নয়নের পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটের আকার যতই বড় হোক না কেন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে বাজারে স্বস্তি, নিরাপদ কর্মসংস্থান, স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা এবং মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা। বিশেষ করে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে টানা দুই মাস ঊর্ধ্বমুখী আছে মূল্যস্ফীতির পারদ। এজন্য মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট, তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রভাব রেখেছে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।



