সুগন্ধার ভাঙনে অসহায় হাজারো মানুষ

Printed Edition
সুগন্ধার ভাঙনের দৃশ্য : নয়া দিগন্ত
সুগন্ধার ভাঙনের দৃশ্য : নয়া দিগন্ত

আতিকুর রহমান ঝালকাঠি

‘আমার স্বামীর কবরটাও নদীতে চলে গেছে। এখন মানুষ মরলে কোথায় কবর দেব, সেই চিন্তায় থাকতে হয়।’ কথাগুলো বলতে বলতে চোখ মুছছিলেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী মাকসুদা বেগম। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা শুধু বসতভিটা হারানো নয়, সুগন্ধা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে তার স্বামীর কবরটিও। তাই প্রিয়জনকে দাফনের জায়গা নিয়ে এমন উদ্বেগের কথা বলেছেন মাকসুদা।

মাকসুদা বেগম জানান, নদীর তীরে ছিল তাদের পৈতৃক বাড়ি। ভাঙনে সেটি হারিয়ে যাওয়ার পর ছেলেরা একটু দূরে নতুন ঘর তুলেছিল। কিন্তু সেটিও রক্ষা পায়নি। শেষ সম্বল ভিটেমাটি, গাছপালা ও ফসলি জমি চলে গেছে নদীর অতলে। এখন অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে কোনোমতে বসবাস করছেন তারা। তার অভিযোগ, এমন ক্ষতির পরও কেউ কোনো কার্যকর সহায়তা বা প্রশাসন থেকে স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

সুগন্ধা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে নলছিটি উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের শত শত পরিবার বছরের পর বছর ধরে সর্বস্ব হারিয়েছে। বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক বাড়ে নদী পাড়ের মানুষের। পাড়ঘেঁষা ঘরবাড়ির বাসিন্দারা প্রতিদিন আশঙ্কা করেন, পরদিন সকালে হয়তো তার ঘরটিও হয়তো থাকবে না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বারইকরন, সরই, তিমিরকাঠি, দরিরচর, খোজাখালী, মল্লিকপুর, সিকদারপাড়া, বহরমপুর, ষাটপাকিয়া, কাঠিপাড়া ও অনুরাগসহ ১০টিরও বেশি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারইকরন, সরই, খোজাখালী, দরিরচর, তিমিরকাঠি ও সিকদারপাড়া।

সরই গ্রামের বাসিন্দা রশিদ মোল্লা বলেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নদীভাঙন চলছে। এ সময়ে শত শত পরিবার বসতভিটা, পানের বরজ, গাছপালা ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারিয়েছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

হেপী বেগমের ঘর এখন নদীর একেবারে কিনারায়। তিনি বলেন, প্রতিদিনই মনে হয়, এই বুঝি ঘরটা নদীতে চলে গেল। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটে তার। মগড় ইউনিয়নের কাঠিপাড়া গ্রামের ইউসুফ হাওলাদার জানান, তাদের গ্রামে আগে ২০-৩০টি পরিবার ছিল। এখন টিকে আছে মাত্র দুই-তিনটি পরিবার। তার ভাষায়, ‘আমরা কোনো অনুদান চাই না, শুধু নদীভাঙন বন্ধের স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।’

অবসরপ্রাপ্ত তহসিলদার হাজী আব্দুল হক তালুকদার বলেন, যেখানে একসময় অসংখ্য বসতঘর ছিল, এখন সেখানে লঞ্চ চলাচল করে। নদী ধীরে ধীরে তার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। সরই গ্রামের ইউপি সদস্য বেল্লাল হোসেন মোল্লা বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, ঝালকাঠি ও নলছিটির ভাঙনকবলিত এলাকায় একটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। অন্য ভাঙনপ্রবণ স্থানগুলোতেও প্রাথমিক জরিপ শেষ হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে নদীপাড়ের মানুষের দাবি, আর আশ্বাস নয়- দ্রুত কার্যকর নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়া হোক। তারা বলেন, ভিটেমাটি হারালে নতুন করে ঘর তোলা যায়, কিন্তু পূর্বপুরুষদের কবর আর শেকড় হারিয়ে গেলে জীবন থেকে মুছে যায় সব স্মৃতি, যা আর ফিরে পাওয়া যায় না।