প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বরাদ্দ বাড়ছে

ভূমিকম্প মোকাবেলায় নেয়া হচ্ছে মেগা পরিকল্পন

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় আবারো সামনে এসেছে বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প-সংবেদনশীল অঞ্চলে অবস্থিত। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্প মোকাবেলায় দেশের প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখার পরামর্শ দেয়ায় সরকার এবার ভূমিকম্প মোকাবেলায় মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকাকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় বিশ্বের বিভিন্ন ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের অভিজ্ঞতা ও আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আলোকে একটি জাতীয় মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে এ খাতে।

চলতি বছর রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ গত ১১ জুন রাত প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট সীমান্তসংলগ্ন এলাকা। এর আগে ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে ভুটানকে কেন্দ্র করে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকায় অনুভূত হয়। এ ছাড়া ২৬ মে বেলা ১১টা ৪২ মিনিটে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কাছে ৩ দশমিক ৬ মাত্রার কম্পন এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে সিকিমকে কেন্দ্র করে ৪ দশমিক ৬ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয়। যদিও এসব ঘটনায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন কম্পন দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এটি মোকাবেলা নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে প্রস্তুতির তেমন কোনো অগ্রগতি ছিল না। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ভূমিকম্প মোকাবেলায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকল্পে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবনা, ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিকাঠামো পুনর্নির্ধারণ, ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, অ্যাক্টিভ ফল্ট ম্যাপিং অ্যান্ড হ্যাজার্ড অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা, দেশব্যাপী জনসচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ, জাতীয় ভূমিকম্প মহড়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া, নগর অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতা জোরদারকরণ, ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা ও সতর্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দুর্যোগ যোগাযোগব্যবস্থা জোরদারকরণ, একই সাথে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রযুক্তির ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: সাইদুর রহমান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোকে আরো সহনশীল ও নিরাপদ করে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে। জনসচেতনতা, নিরাপদ অবকাঠামো এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবেলায় যেমন আমরা সক্ষমতা তৈরি করেছি, তেমনি ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবেলায়ও আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, দুর্যোগ ঘটার পর নয়; বরং দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি কমানো এখন বৈশ্বিক কৌশল। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং দেশীয় বাস্তবতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর প্রস্তুতি কাঠামো গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে এ খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব বেড়েছে। বাজেট উপস্থাপনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় ৫২১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ও ১১টি এরিয়াল প্ল্যাটফর্ম ল্যাডার ক্রয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) জন্য ১০০ ভাগ বেতার যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

ভূমকম্পন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো থেকে বাংলাদেশ যে সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চলের প্রভাববলয়ে রয়েছে তা আবারো স্পষ্ট হয়েছে। রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নগরী হিসেবে বিবেচিত। অপরিকল্পিত নগরায়ন, পুরনো ভবন, সঙ্কীর্ণ সড়ক, অত্যধিক জনঘনত্ব এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতার কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৭ বা তার বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প রাজধানীর নিকটবর্তী কোনো ফল্ট লাইনে আঘাত হানলে হাজার হাজার ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনার আওতায় ভবিষ্যতে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি, বাধ্যতামূলক ভবন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ভূমিকম্প মহড়া সম্প্রসারণ, আধুনিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার ইউনিট গঠন, ড্রোন ও থার্মাল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সমন্বিত জরুরি অপারেশন সেন্টার স্থাপনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ভূমিকম্প বার্তা দিচ্ছে যে, আমাদের এখানে বড় আকারে ভূমিকম্প আসছে। যেটা অনেক দিন ধরে আমরা বলছিলাম। ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জেনেছি। আমরা আশা করছি, সরকার দ্রুত ভূমিকম্প মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়; কিন্তু আগাম প্রস্তুতি, নিরাপদ নির্মাণব্যবস্থা, কার্যকর নগর পরিকল্পনা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, দ্রুত নগরায়নের এই সময়ে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবেলায় একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ভূমিকম্পের প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকার দুই সিটিতে ৪৪৫টি আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা কারিকুলামে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিষয়েও সরকার ভাবছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সংস্থা থেকে এক লাখ ৪৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের খসড়া তালিকা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে বড় বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।