কোনো না কোনো দিকে এগিয়েই থাকে ব্রাজিল

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিশ্বকাপের ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, ব্রাজিলের নাম ততদিন থাকবে সবার আগে। কারণ কোনো না কোনো দিকে এগিয়ে থাকাই যেন ব্রাজিলের নিয়তি। আর এ কারণেই তারা শুধু পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নয়, তারা বিশ্বফুটবলের চিরন্তন মহারাজ। ফুটবলে অনেক দল আসে, অনেক দল যায় কিন্তু ব্রাজিল একটি দল নয়, এটি এক অনন্ত অনুভূতির নাম।

হাইতির বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে সহজ জয় পাওয়ার পর আবারো বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার অবস্থান ফিরে পেয়েছে ব্রাজিল। এই জয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জার্মানিকে টপকে আবারো উঠে গেছে শীর্ষে! বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র দু’টি দলই ২০০-এর বেশি গোল করতে পেরেছে-ব্রাজিল ও জার্মানি। ১৫২ গোল নিয়ে অনেকটা পিছিয়ে থেকে তৃতীয় স্থানে আর্জেন্টিনা।

ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে জোড়া গোল করেন মাতেউস কুনহা এবং একটি গোল করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্বস্তির জয় পায় কার্লোস আনচেলত্তির দল। ম্যাচের আগে ব্রাজিল ও জার্মানির মধ্যে গোলসংখ্যার লড়াই ছিল বেশ কড়া। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় ব্রাজিলের গোল ছিল ২৩৭টি, যা জার্মানির চেয়ে পাঁচটি বেশি ছিল। তবে প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সাথে ১-১ গোলে ড্র করার পর এবং জার্মানির কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ৭-১ গোলের বড় জয়ের কারণে সাময়িকভাবে জার্মানি এগিয়ে যায়। সে ম্যাচের পর জার্মানির মোট গোল ছিল ২৩৯ টি, আর ব্রাজিল ছিল পিছিয়ে। তবে হাইতির বিপক্ষে তিন গোল করে ব্রাজিল আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। এই জয়ের পর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে মোট গোল ২৪১, যা জার্মানির চেয়ে দুই গোল বেশি। ফলে আবারো শীর্ষে সেলেসাওরা।

গ্রুপ সি-তে ব্রাজিল এখন গোল ব্যবধানে শীর্ষে আছে। অন্য দিকে একই গ্রুপে মরক্কোও ভালো অবস্থানে রয়েছে, ফলে গ্রুপ পর্বের লড়াই আরো জমে উঠেছে। আগামী ২৪ জুন মায়ামিতে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্রাজিল মুখোমুখি হবে স্কটল্যান্ডের। অন্য দিকে জার্মানি তাদের পরবর্তী ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে মাঠে নামবে।

বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু দল আছে, যারা শুধু ম্যাচ জেতে না, যুগের পর যুগ ধরে ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দেয়। ব্রাজিল যেন ফুটবলের এক অবিরাম উৎসব। সময় বদলেছে, খেলোয়াড় বদলেছে, কৌশল বদলেছে ; কিন্তু ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক সৌন্দর্য আর গোল করার নেশা কখনো বদলায়নি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ২০০-এর বেশি গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেছে মাত্র দু’টি দল ব্রাজিল ও জার্মানি। তবে সর্বোচ্চ গোলের মুকুটটি আবারো ব্রাজিলের মাথায়। আর এটাই প্রমাণ করে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে গোলের ভাষায় কথা বলতে জানে হলুদ জার্সিধারীরাই।

ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিলের যাত্রা শুধু সংখ্যার গল্প নয়। এটি সৌন্দর্যের গল্প, আবেগের গল্প, শিল্পের গল্প। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, কাকা, রিভালদো হয়ে নেইমার প্রতিটি যুগে তারা জন্ম দিয়েছে এমন সব তারকার, যাদের পায়ের জাদু মুগ্ধ করেছে কোটি কোটি দর্শককে। পৃথিবীর অনেক দেশ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখে ; কিন্তু ব্রাজিলের কাছে বিশ্বকাপ মানেই শিরোপার দাবিদার হিসেবে মাঠে নামা।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাদের পুনর্জন্মের ক্ষমতা। কোনো এক প্রজন্ম বিদায় নিলে মনে হয়, এবার হয়তো ব্রাজিলের জৌলুস কমবে। কিন্তু কিছুদিন পরই নতুন একদল তরুণ উঠে আসে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে, নতুন ছন্দে। তাই ব্রাজিল কখনো অতীতের গৌরবে আটকে থাকে না, তারা ভবিষ্যতের দিকেও সমান গতিতে ছুটে চলে।

এই কারণেই বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে ব্রাজিলকে ঘিরে থাকে আলাদা উন্মাদনা। কারণ তারা শুধু একটি দল নয়, তারা এক আবেগের নাম। তারা শুধু ট্রফি জেতে না, মানুষের হৃদয় জয় করে। আর গোলের রেকর্ডে আবারো সবার ওপরে উঠে তারা যেন নতুন করে জানিয়ে দিলো, ফুটবলের রাজমুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙটি এখনো হলুদ আর সবুজ।