ফিরে দেখা জুলাই ’২৪

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হাসিনার পতনের ইঙ্গিত

Printed Edition
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হাসিনার পতনের ইঙ্গিত
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হাসিনার পতনের ইঙ্গিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত অসহযোগ কর্মসূচি এদিন নতুন ও বিস্ফোরক মোড় নেয়। দিনের শুরুতে দেশজুড়ে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তত ২০টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, সহিংসতা, ঘটে রক্তপাত।

প্রতিবাদকারী, পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সারা দেশে অন্তত ৯৩ জন নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। এর ফলে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যায়।

সকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা আন্দোলন দমনে রাস্তায় নামলে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ শুরু হয়।

সিরাজগঞ্জে একদল উত্তেজিত জনতা একটি থানায় হামলা চালিয়ে ১৩ জন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে। পাশের রায়গঞ্জ উপজেলায় আরো পাঁচজন নিহত হন। ফলে ওই দিন সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সিরাজগঞ্জ জেলায়।

রাজধানী ঢাকাও পরিণত হয় সংঘর্ষের নগরীতে। ফার্মগেট, ধানমন্ডি, মিরপুর-১০, উত্তরা, শাহবাগ ও গুলিস্তান এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

ফার্মগেটে লাঠি ও সড়কের ব্যারিকেড নিয়ে এগিয়ে আসা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা গুলি চালায়। জবাবে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।

ধানমন্ডিতে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। পুরো এলাকা গুলির শব্দ ও স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

শাহবাগে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) প্রাঙ্গণেও। সেখানে অন্তত ২৪টি যানবাহনে আগুন দেয়া হয়।

মিরপুর-১০ এলাকায় বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি হয় সশস্ত্র আওয়ামী লীগ সমর্থক ও পুলিশ। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে গুলির শব্দ শোনা যায়। পুরান ঢাকায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে সংঘর্ষে শতাধিক বিক্ষোভকারী ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা প্রবেশ করেন। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং পুলিশের কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর বাইরে লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী, ফেনী, রংপুর, সিলেট, বগুড়া, পাবনা, মুন্সীগঞ্জ, মাগুরা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়। কোথাও বিক্ষোভকারীদের মারধর, কোথাও গুলি করা হয়। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও যানবাহনে আগুন দেয়া হয়।

শুধু চট্টগ্রামেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ১৭২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ও ভাঙচুর করা হয়।

রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মধ্যেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্টে এগিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।

বেলা ৩টার দিকে শাহবাগে সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। তিনি দেশজুড়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং সরকারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। পরে নিহতদের লাশ নিয়ে মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

এ দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের শিক্ষার্থী নয়, ‘অপরাধী’ হিসেবে আখ্যা দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অভিভাবকদের সন্তানদের রাজপথ থেকে সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং ‘জঙ্গি হুমকি’র কথা উল্লেখ করা হয়।

এক পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনে প্রথমে রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করবে; আইন লঙ্ঘন বা দাঙ্গার পরিস্থিতিতে শেষ বিকল্প হিসেবে জীবন্ত গুলি ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যথায় সরাসরি প্রাণঘাতী গুলি চালানো আইনসম্মত নয়।

ঢাকার রাওয়া ক্লাবে এক সমাবেশে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীকে রাজপথ থেকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানান। অন্য দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে শিক্ষক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এ প্রস্তাব ঘোষণা করেন।

এদিন বিএনপিও আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবির পক্ষে দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ।

দিনের শেষে সরকার ৪জি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্লক এবং ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রশাসনিক এলাকাগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেয়।