মরক্কো-সেউতা সীমান্তে অভিবাসীদের প্রাণহানি বেড়ে ৭২

Printed Edition

আলজাজিরা

মরক্কো থেকে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতা সীমান্তে ব্যাপক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশের চেষ্টার মুখে অন্তত ৭২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সেউতায় নিযুক্ত স্পেনীয় প্রতিনিধি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের এই ঢলের পর সীমান্ত এলাকা থেকে একের পর এক লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি সেউতার উপকূল থেকে আরো পাঁচটি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্পেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বৃহস্পতিবার থেকে সীমান্তজুড়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে হাজারেরও বেশি মানুষকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রবেশ করা অভিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার সদস্য স্বেচ্ছায় কিংবা প্রক্রিয়াগত কারণে মরক্কোতে ফেরত গেছেন। এই চরম সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২টি সদস্যরাষ্ট্র যৌথ সীমান্ত সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতালি স্পেনের সাথে সীমান্ত পারাপারের শেনজেন সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এ ছাড়া সেউতা উপকূলে সাগরে একটি বিশেষ ভাসমান সীমান্ত বেড়া তৈরি করা হয়েছে।

সেউতায় স্পেন সরকারের প্রতিনিধি মিগেল অ্যাঞ্জেল পেরেজ পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণে আসার ইঙ্গিত দিলেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে আরো সময় লাগবে বলে জানান। তিনি নিশ্চিত করেন যে, এখন পর্যন্ত ৭২টি লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদ সংস্থা ইএফই ইঙ্গিত দিয়েছে, নিহতের এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। স্পেনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘সিভিল গার্ড’ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা লাশগুলোর পরিচয় পাওয়ার কাজ শুরু করেছে। সংস্থাটির ফরেনসিক কর্মকর্তা কার্লোস আতুচি জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সব ক’টি লাশের বায়োমেট্রিক ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া সমাপ্ত করা হবে। নিহতদের বড় অংশ সমুদ্রে ডুবে মারা যান। এ ছাড়া সীমান্ত প্রাচীর টপকানোর চেষ্টা এবং তীব্র ভিড়ে পদদলিত হয়েও অনেকের মৃত্যু ঘটে।

মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্পেনের আদালতের একটি ভুয়া রায় ও মানব পাচারকারীদের ছড়ানো গুজবের কারণেই এত মানুষ একসাথে সীমান্তে জড়ো হয়েছিল। সাগরে আটককৃতদের সরাসরি ফেরত পাঠানো যাবে না- এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালায়। মরক্কো প্রশাসন নিজ ভূখণ্ডে ১১ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করে বাকি লাশের বিষয়ে সত্যতা যাচাইয়ের কাজ করছে। অন্য দিকে সেউতার প্রশাসনিক প্রধান হুয়ান হিসুস ভিভাস জানান, সাম্প্রতিক এই সঙ্কট ও গত কয়েক সপ্তাহে সাঁতরে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টায় মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয় মর্গে মোট ৮৮টি লাশ রাখা হয়েছে। মরক্কো উপকূল থেকেও বেশ কিছু লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস জানান, অনুপ্রবেশকারীদের বড় অংশই বর্তমানে মরক্কো সীমানায় ফিরে গেছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফরাসি নাগরিক কারিমা আবেনাজ এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি দেখে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আধুনিক যুগে এসে জীবন বাঁচাতে কোলের শিশুকে নিয়ে সাগরে নেমে প্রাণ বিসর্জন দেয়ার ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। সরকারের কাছে অধিকারের দাবি না জানিয়ে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঝাপ দেয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। উল্লেখ্য, উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা সেউতা ও মেলিইয়ার সীমান্তই হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আফ্রিকান ভূখণ্ডের একমাত্র স্থলপথ। ফলে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার অভিবাসী মরক্কোর উপকূল থেকে সাঁতরে বা স্থলসীমান্ত পেরিয়ে এই দুই শহরের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছানোর সুযোগ খোঁজেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বর্তমানে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি ভাসমান প্রতিবন্ধক নির্মাণ করা হয়েছে। স্পেন সরকার নীতিগতভাবে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল মনোভাব দেখালেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অবৈধভাবে সেউতায় প্রবেশকারীদের মূল স্প্যানিশ ভূখণ্ড কিংবা ইউরোপের অন্য কোথাও যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে না।