নদী লুটের মহোৎসব

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition
  • বালু লুট করে রাতারাতি শতকোটি টাকার মালিক
  • কয়েক হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত
  • প্রতি বছর নদীতে বিলীন ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টর জমি

বিগত আওয়ামী আমলে সারা দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের মহোৎসব চললেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে তা বন্ধ থাকে দীর্ঘসময়। ২০২৬ এর নির্বাচনের পরে গত তিন মাসে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন নদী থেকে আবারো শুরু হয় অবৈধ বালু উত্তোলন। এসব অবৈধ লুটের কারণে রাষ্ট্র রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুক্ষীণ হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে, রাজশাহীতে, নড়াইলের কালিয়া উপজেলায়, কক্সবাজারের চকরিয়ায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায়, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে।

সোনারগাঁওয়ে ১৮কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট অবৈধ বালু উত্তোলন

দেশের বিভিন্ন স্থানে গত তিন মাসে যে পরিমাণ নদী থেকে বালু লুট করা হয়েছে তার ৭০ ভাগ হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে। সরকার গঠনের পরে উপজেলাটিতে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদী খননের (ড্রেজিং) নামে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। দিনে নিয়ম মেনে নদীখননের কথা থাকলেও বাস্তবে রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু লুট করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু কাটার ফলে মেঘনা নদীর তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাট, মেঘনা এলপিজি ও আমান সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বিশাল এলাকা নদীতে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এ ছাড়া মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত মেঘনা ব্রিজও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে মুন্সীগঞ্জের ‘চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রাইভেট) লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেঘনা নদী খননের কার্যাদেশ পায়। নিয়ম অনুযায়ী, দিনের বেলায় অনুমোদিত কাটিং ড্রেজারের মাধ্যমে নদী খনন করে নির্ধারিত স্থানে বালু ফেলার কথা কিন্তু ইজারাদারেরা সেই নিয়ম মানছেন না। এ ছাড়া প্রায় ৮৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন থাকলেও সন্ধ্যা নামলেই নদীর আনন্দবাজার হাটসংলগ্ন এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫টি শক্তিশালী ড্রেজারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ হিসাবে বিগত তিন মাসে চক্রটি ১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে দিয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই অবৈধ টাকার একটি অংশ যায় স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের পকেটে।

স্থানীয়রা জানান, সোনারগাঁওয়ের ব্যবসায়ী মোমেন সিকদার এই ইজারার কাজ পরিচালনার দায়িত্ব পান। পরে স্থানীয় যুবদল নেতা ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুম রানার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই খননকাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত বর্ষায় এই চক্রের বালু কাটার কারণে পিরোজপুর ইউনিয়নের নুনেরটেক গ্রামের গ্রায় ৩০টি বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ধলাই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন করে একটি অসাধু চক্র। সম্প্রতি অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের চার কর্মচারী আহত হয়েছেন।

অভিযান সূত্রে জানা গেছে, ধলাই ব্রিজের নিচে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়ার নেতৃত্বে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) পলাশ তালুকদারসহ প্রশাসনের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত একটি ট্রাক্টর জব্দ করা হয়। ট্রাক্টর জব্দের পর বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ লোক একত্র হয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়। এ ঘটনায় চার কর্মচারী আহত হন। তবে ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অক্ষত ছিলেন। খবর পেয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এ সময় চারজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজা দেয়া হয়।

এ ছাড়া রাজশাহীতে, নড়াইলের কালিয়া উপজেলায়, কক্সবাজারের চকরিয়ায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায়, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে।

অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের প্রধান ক্ষতিকারক দিক

১. নদীভাঙন বৃদ্ধি : বাংলাদেশ পানি উনয়ন বোর্ডের (ইডউই) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার হেক্টর জমি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. সেতু ও অবকাঠামোর ক্ষতি : নদীর তলদেশ গভীর হয়ে গেলে সেতুর পিলার ও ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতর বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, নদীর কাছাকাছি অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে বহু সেতু ও কালভার্ট ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

৩. কৃষিজমি ও বসতভিটার ক্ষতি : নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই দশকে লক্ষাধিক পরিবার নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

৪. জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি : বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর তলদেশের পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশীয় মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়।

৫. ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর প্রভাব : অতিরিক্ত বালু উত্তোলন নদীর সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক সংযোগকে প্রভাবিত করতে পারে, ফলে স্থানীয়ভাবে পানির স্তর পরিবর্তিত হয়।

৬. নৌপথ ও নদীর গতিপথ পরিবর্তন : নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে কোথাও গভীর গর্ত এবং কোথাও অতিরিক্ত পলি জমা সৃষ্টি হয়। এতে নৌচলাচল ও নদী ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে ওঠে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

বাংলাদেশে অবৈধ বালু উত্তোলনসংক্রান্ত একক কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, গত দুই দশকে নদীভাঙনে প্রায় ২লাখ হেক্টর জমি বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ১৫ লাখের মতো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিন লাখ পরিবার। অর্থনৈতিক ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, নদীভাঙনজনিত ক্ষতির কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার সম্পদ হারায়। যদিও এর সবটাই বালু উত্তোলনের কারণে নয়, তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন নদীভাঙন ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।