বিশেষ সংবাদদাতা
স্বয়ংক্রিয়করণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে তৈরী পোশাক শিল্পে ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি হুমকির মুখে। আর ২০৪১ সালের মধ্যে তৈরী পোশাক খাতে নারীদের ৬০ শতাংশ চাকরি হারাতে পারে। ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে। যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারীকর্মীদের বলে উল্লেখ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আর সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, কর্মেেত্রর জগৎ পরিবর্তিত হচ্ছে। শ্রম-বাস্তুতন্ত্র বদলে যাচ্ছে। বিদ্যমান নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো এর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে।
গতকাল সিপিডি আয়োজিত ‘ওয়ার্ক ইন ফাক্স : ফোরসাইট ফর দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক ইন দ্য গ্লোবাল সাউথ’ বা পরিবর্তনশীল কর্মজগৎ : গ্লোবাল সাউথে কাজের ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী ভাবনা’ শীর্ষক বৈশ্বিক ওয়েবিনারে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে সভাপতিত্ব করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির বাংলাদেশবিষয়ক ‘ফোরসাইট’ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক প্যানেল অংশ নেন। যার মধ্যে ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কর্মসূচি প্রধান ও এসএমই বিশেষজ্ঞ গুঞ্জন বাহাদুর ডাল্লাকোটি, শ্রীলঙ্কার লার্ন-এশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেলানি গালপায়া, আর্জেন্টিনার ‘সুর ফুতুরো ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান রামিরো আলব্রিউ এবং ভারতের ‘জাস্টজবস নেটওয়ার্ক’-এর প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী পরিচালক সাবিনা দেওয়ান। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রোপট বিবেচনায় নিয়ে প্যানেলিস্টরা কর্মসংস্থানের একটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার েেত্র প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অটোমেশন, দতা উন্নয়ন, শ্রমবাজারের রূপান্তর এবং সামাজিক সুরার প্রভাব ও গুরুত্ব পর্যালোচনা করেন।
সিপিডির উপস্থাপনায় তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমবাজার প্রায় ৯০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিকতা দ্বারা প্রভাবিত। যেখানে নারী এবং সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ পড়ে। বর্ধিত মূল্য সংযোজন সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মন্থর। কর্মসংস্থান, শিা বা প্রশিণের বাইরে থাকা তরুণদের উচ্চ অনুপাত এবং শ্রমশক্তিতে নারী অংশগ্রহণের হার কম। ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয়তা, ক্রমবর্ধমান দতার ব্যবধান এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা। দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি। আর বৈশ্বিক বিপর্যয় (মহামারী, জলবায়ু সঙ্কট, ঋণের চাপ, প্রযুক্তিগত উপনিবেশবাদ) কর্মজগৎকে নতুন রূপ দিচ্ছে, যেখানে দেিণর দেশগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশন এক কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করলেও প্রায় ৯০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত করবে। ফলে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার সমতার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। বর্তমানে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির হয়ে আছে, যদিও উৎপাদন বেড়েছে। অন্য দিকে সেবা খাতে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও এর বড় অংশই অনিরাপদ ও নি¤œ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান। শিাব্যবস্থায় অর্জিত দতার সাথে শ্রমবাজারের চাহিদার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিায় (টিভিইটি) ভর্তি ২০ শতাংশেরও কম এবং শিা ও দতা উন্নয়নে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
সিপিডি বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তর চলছে। কর্মসংস্থান, অন্তর্ভুক্তি এবং স্থিতিস্থাপকতা জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন শ্রমবাজার সংস্কার এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের েেত্র অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা যোগ করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতিকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে এবং নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোকে কার্যকরভাবে অবহিত করার জন্য জাতীয় তথ্য পরিকাঠামো অপর্যাপ্ত।
তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, গবেষণায় ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিতকারী ২৭টি পরিবর্তনের চালিকাশক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এগুলো বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং জাতীয় সামাজিক আকাক্সার পরিবর্তন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অনিশ্চয়তাগুলোর ফলাফল যেমনই হোক না কেন, পাঁচটি বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকবে। এগুলো হলোÑ অপরিবর্তনীয় ডিজিটালাইজেশন, উচ্চ-মূল্যের সেবার দিকে স্থানান্তর, দতার অসামঞ্জস্যের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বাণিজ্য বিঘেœর মতো বাহ্যিক অভিঘাতের ঝুঁকি। ভবিষ্যতের সুযোগ থেকে কারা উপকৃত হবে তা নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা বা নমনীয়তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় গবেষণায় আটটি অগ্রাধিকারমূলক নীতিগত পদেেপর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিা ও দতা উন্নয়নের সংস্কার, আজীবন দতা পুনঃউন্নয়ন, কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক শিল্পনীতি, শ্রমবাজারের তথ্যব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য আধুনিক সামাজিক সুরাব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট রূপান্তরকালীন সহায়তা।
ওয়েবিনারে ড. দেবপ্রিয় উল্লেখ করেন যে, প্রথাগত পূর্বাভাস পদ্ধতি, যা মূলত অতীতের তথ্য ও রৈখিক প্রাক্কলনের ওপর নির্ভরশীল শ্রমবাজারে দ্রুত প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়ার েেত্র ক্রমশ অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ছে। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎকেন্দ্রিক বিশ্লেষণপদ্ধতি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অন্বেষণ এবং দূরদর্শী নীতি প্রণয়নে সহায়তা করার েেত্র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে কাজ করে।
এ ছাড়া ওয়েবিনারে আলোচকরা বলেন, শিা ও দতা উন্নয়নকে শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে আরো ভালোভাবে সমন্বয় করা উচিত। কর্মশক্তি উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) সম্প্রসারণ করা, সামাজিক সুরাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অটোমেশনের অসম প্রভাব মোকাবেলা করা এবং ডিজিটাল রূপান্তর যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তা নিশ্চিত করার ওপর জরুরিভাবে জোর দিতে হবে। তারা বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হলেও, কাজের ভবিষ্যৎ বিদ্যমান বৈষম্য কমাবে, নাকি বাড়াবে, তা শেষ পর্যন্ত জননীতিই নির্ধারণ করবে।
আলোচকরা বলেন, কাজের ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করা হয়েছে। এখন অগ্রাধিকার অবশ্যই সমস্যা নির্ণয় থেকে বাস্তবায়নের দিকে সরাতে হবে। তারা সরকার, নিয়োগকর্তা, উন্নয়ন অংশীদার এবং গবেষকদের মধ্যে আরো শক্তিশালী সমন্বয়ের আহ্বান জানান, যাতে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণকে এমন দূরদর্শী নীতিতে রূপান্তরিত করা যায় যা অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা এবং শোভন কাজকে উৎসাহিত করবে। একই সাথে নিশ্চিত করবে যে কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে।
ওয়েবিনারটি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কর্তৃক জাস্টজবস নেটওয়ার্ক, লার্নএশিয়া, সাউদার্ন ভয়েস এবং সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশÑ এর সহযোগিতায় এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (আইডিআরসি) সমর্থিত ফিউচারওয়ার্কস এশিয়া উদ্যোগের অধীনে আয়োজিত হয়েছিল।



