সংসদ প্রতিবেদক
গত পাঁচ অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে। আর সব চেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের সাথে। জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তিনি বলেন, বিগত সরকারের ভুলনীতির ফলে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়।
গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সরকারি দলের সদস্য জসীম উদ্দিন আহমেদের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র এ সময় তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৬ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৮ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ১৮, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৫০ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাণিজ্য ঘাটতি ২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আমদানি ও রফতানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী সার্কভুক্ত দেশ ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভুটানের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি আছে। এর মধ্যে ভারতের সাথে ঘাটতি সাত হাজার ৮৫৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাকিস্তানের সাথে ৬৮১ দশমিক ৩, ভুটানের সাথে ২৯ দশমিক ৭৭ এবং আফগানিস্তানের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ১০ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সাথে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত রফতানিকৃত খাদ্য পণ্যগুলো হলো- চা, শাকসবজি, ফলমূল, পান পাতা, তৈল বীজ, চিনি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ভোজ্য তেল, বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় এবং সাদা ও হিমায়িত মাছ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্য পণ্যগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা, ভারত, নেদারল্যান্ডস, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশগুলোতে রফতানি করা হয়। নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের রফতানি বাণিজ্য তৈরী পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল এবং রফতানি আয়ের ৮৪ ভাগ এ খাত থেকে অর্জিত হয়। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত, কৃষিজ পণ্য, ওষুধ শিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, হিমায়িত খাদ্য/মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্য আংশিক রফতানি কারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক গ্যারান্টি বিনিময়ে বন্ডের সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
জামালপুর-৩ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২০২ দেশে পণ্য রফতানি করা হয়েছে।
দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি তিন বছর ধরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে আটকে আছে বলে সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যায়নি। এতে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা কমেছে এবং খাতটির সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, চামড়ার রফতানি এক বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে। ১ দশমিক ১০ থেকে ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
৬০ লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে : নরসিংদী-৫ আসনের সদস্য আশরাফ উদ্দিন কোরবানির চামড়ার বাজার, নির্ধারিত দাম এবং সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, তা লবণযুক্ত সংরক্ষিত চামড়ার দাম। তিনি বলেন, চামড়ার গুণগত মান, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং পশুর ধরনভেদে বাজারমূল্য ভিন্ন হয়। পশুর গা থেকে চামড়া খুলে নেয়ার সময় সেটা যদি দক্ষতার সাথে করা হয়, সেটার মূল্যও আলাদা হয়।
মন্ত্রী বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর সংখ্যা নিয়ে সরকারের কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে প্রায় এক কোটি এক লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের রুমিন ফারহানা প্রশ্ন করেন, আমদানি ও রফতানির আড়ালে প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটি ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ আছে কি না।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং গবেষণাভিত্তিক। এটা একটা পারসিভড অ্যামাউন্ট। এটি শুনতে বা বলতে যত সহজ, বাস্তবে তত সহজ নয়। তিনি বলেন, দেশে বছরে প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলারের আমদানি এবং ৫৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি হয়। প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের এই বাণিজ্যের মধ্যে ঠিক কোন পণ্যের মাধ্যমে অর্থপাচার হচ্ছে, সেটা পিনপয়েন্ট করা গবেষণার বিষয়। তবে সরকার এ বিষয়ে সচেতন এবং প্রয়োজনীয় গবেষণা করছে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
প্রশ্নোত্তরের শুরুতে লিখিত উত্তরের অংশ পড়ে শোনাতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ কারণ নয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের ভুল নীতির ফলে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।’ একই সাথে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট, ডলারের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাকেও দায়ী করেন তিনি।



