নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়া, অতিবর্ষণ এবং বঙ্গোপসাগরে ৩ নম্বর সতর্কসঙ্কেত বহাল থাকায় দেশের শীর্ষ দুই সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার ও কুয়াকাটা কার্যত পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটকের আগাম বুকিং বাতিল হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র চার দিনে এ অঞ্চলের পর্যটন খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
গতকাল ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। একই সাথে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে বাস চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হোটেল-মোটেল মালিকদের সংগঠন জানিয়েছে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পর্যটকরা তাদের বুকিং বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে সৈকতে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন পর্যটকও রুমেই অবস্থান করছেন। ফলে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের বিচ বাইক, কিটকট (চেয়ার-ছাতা) এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি অলস সময় পার করছেন। অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতেও।
তাদের ভাষ্য, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যেখানে শতভাগ বুকিং থাকে, সেখানে বৈরী আবহাওয়ার কারণে হোটেলগুলোতে বুকিং ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। খুলনা, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের বড় একটি অংশ তাদের বুকিং বাতিল করেছেন। অনবরত বৃষ্টির কারণে সৈকতে নামতে না পারায় চটপটি, কফি বিক্রেতা এবং স্থানীয় ফটোগ্রাফাররা লোকসানের মুখে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সাগরে লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত আরো কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের সাগরে নামার ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কক্সবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, টানা পাঁচ দিনের বৈরী আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ ও উত্তাল সাগরের প্রভাবে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। ইতোমধ্যে জেলার পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটকের রুম বুকিং বাতিল হয়েছে। তাদের দাবি, মাত্র চার-পাঁচ দিনের বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে বাস চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করলেও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তাদের অনেকেই নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে যাচ্ছেন। আবহাওয়ার উন্নতি না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।
এ দিকে টানা বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় দেখা দিয়েছে পর্যটক খরা। বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে সাপ্তাহিক ছুটিকে ঘিরে পর্যটকের যে ঢল নামার কথা ছিল, তা দেখা যায়নি। অনেক পর্যটক আগাম বুকিং বাতিল করায় বিপাকে পড়েছেন আবাসিক হোটেল-মোটেল মালিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইড, অটোরিকশা চালক ও সৈকতসংলগ্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির সাথে বইছে দমকা হাওয়া। উত্তাল সমুদ্রের কারণে সৈকতে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। যারা কুয়াকাটায় এসেছেন, তারাও অধিকাংশ সময় আবাসিক হোটেলের কক্ষেই অবস্থান করেছেন। ফলে সৈকতজুড়ে ছিল নির্জন পরিবেশ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যেখানে সৈকতে হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে, সেখানে শুক্রবারও ছিল অনেকটাই ফাঁকা।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, টানা বৈরী আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টিপাত এবং উত্তাল সমুদ্রের কারণে কুয়াকাটায় পর্যটকের আগমন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে হোটেল-মোটেলগুলোর কক্ষ দখলের হার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক পর্যটক আগে থেকেই কক্ষ বুকিং দিলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ বুকিং বাতিল করেছেন। এতে হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু হোটেল নয়, পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল রেস্তোরাঁ, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইড, যানবাহন চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সৈকতকেন্দ্রিক অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও কর্মহীন সময় পার করছেন। এখন সবাই আবহাওয়ার উন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারো পর্যটকের আনাগোনা বাড়বে বলে আশা করছি।



