নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই কুতুবদিয়া দ্বীপ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তা রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ এবং দ্বীপের চারপাশে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। অন্যথায় তা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তারা।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড কুতুবদিয়া। ‘অস্তিত্বের সংকটে কুতুবদিয়া দ্বীপ : রাষ্ট্রের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় গতকাল বক্তারা এমন শঙ্কার কথা জানান। দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সম্মিলিত নাগরিক সমাজ এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। এতে অংশ নেন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অব্যাহত ভাঙনে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কুতুবদিয়া দ্বীপ। শত শত পরিবার হারিয়েছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের। এতে থেমে গেছে তাদের জীবিকার চাকা।
এ সময় সরকারের জরুরি উদ্যোগ ছাড়া দ্বীপবাসীর জীবন ও জীবিকা রক্ষা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন তারা। এজন্য সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেন। আলোচনায় জানানো হয়, বাঁধের ভাঙনে কুতুবদিয়ার দক্ষিণ ও উত্তরের বিভিন্ন অংশ প্রতি বছর সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গৃহহীন মানুষ পূর্বপুরুষের ভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিচ্ছে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে, অন্যান্য জেলায়। লবণাক্ততার কারণে চাষের জমিও দিন দিন কমছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভাঙনের কারণে গত ৬০ বছরে এ দ্বীপের প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় পুরো দ্বীপ সাগরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এ দ্বীপের চার পাশের প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। এরপর আলী আকবর ডেইলে শুরু হয় ভাঙন। এ ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ড ‘হুজিয়ার টেক’ ২০১২ সালে পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়ে যায়।
বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে সাগরে জেগে ওঠে এই দ্বীপ। তবে মানুষের বসবাস শুরু হয় পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে। হজরত কুতুবুদ্দীন নামে এক আধ্যাত্মিক পুরুষ এই দ্বীপে আস্তানা গড়েছিলেন বলে লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় ‘কুতুবুদ্দীনের দিয়া’। সেই থেকে দ্বীপের নাম কুতুবদিয়া। তথ্য বাতায়ন বলছে, ১ লাখ ৩৩ হাজার জনসংখ্যার এই উপজেলার আয়তন এখন মাত্র ২৭ বর্গ কিলোমিটার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী জানান, ১৯৫০ সালের ৭৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ ২০০৯ সালে এসে ৬৯ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। এই সময়ে শুধু দ্বীপের দৈর্ঘ্যই কমেছে তিন কিলোমিটার।
গত কয়েক বছরে এ আয়তন আরো কয়েক বর্গকিলোমিটার কমেছে। এ ধরনের ডেল্টা আকৃতির দ্বীপ এমনিতেই ভাঙনপ্রবণ। নিয়মিত বিরতিতে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় নিরাপত্তার অভাবে ভাঙন আরো বেশি হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে কুতুবদিয়ায় কৃষি জমি ছিল চার হাজার ৭০০ হেক্টর, লবণ মাঠ ছিল ৩০০ হেক্টর। আর উপজেলা তথ্য বাতায়নের হিসাব অনুযায়ী, এখন কৃষি জমি আছে তিন হাজার ৫২০ হেক্টর আর লবণ মাঠ এক হাজার ৭৮৮ হেক্টর।



