ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় ম্যাচ অনেক সময় পুরো টুর্নামেন্টের গতি বদলে দেয়। প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর পর পরবর্তী ম্যাচ হয়ে ওঠে হিসাব বদলে দেয়ার সুযোগ, আবার ভুল করলে সামনে আসে বিদায়ের শঙ্কা। ঠিক এমন বাস্তবতার মধ্যেই বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ ‘জি’-তে আজ রাত ১টায় লস অ্যাঞ্জেলেসে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের শক্তিশালী দল বেলজিয়াম ও এশিয়ার অন্যতম ধারাবাহিক দল ইরান।
প্রথম ম্যাচ শেষে গ্রুপের চার দলই এক পয়েন্ট করে সংগ্রহ করেছে। ফলে কাগজে-কলমে এটি দ্বিতীয় ম্যাচ হলেও বাস্তবে ম্যাচটি অনেকটা নকআউটের আগের নকআউট। জয়ী দল শেষ ম্যাচের আগে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই শক্ত করবে, আর হারলে শেষ ষোলোর আশা কঠিন সমীকরণের ওপর নির্ভর করতে পারে।
বিশ্ব ফুটবলে বেলজিয়ামের পরিচয় বহুদিন ধরেই প্রতিভায় ভরা এক দল হিসেবে। গত এক দশকে তারা ধারাবাহিকভাবে বড় টুর্নামেন্টে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সম্ভাবনাকে তারা বড় শিরোপায় রূপ দিতে পারেনি। কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় এবং পরবর্তী বড় আসরেও হতাশাজনক পারফরম্যান্স দলটির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
এই বিশ্বকাপেও শুরুটা প্রত্যাশামতো হয়নি। মিশরের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে রেড ডেভিলসদের। ম্যাচের শুরু থেকেই কিছুটা ধীরগতির ফুটবল খেলেছে তারা এবং আক্রমণে প্রয়োজনীয় ধার দেখা যায়নি। প্রতিপক্ষের গোলে পিছিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে।
মিশরের হয়ে ইমাম আশুরের দুর্দান্ত গোল বেলজিয়ামকে চাপে ফেলে দেয়। তবে অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায় ইউরোপিয়ানরা। শেষ পর্যন্ত রোমেলু লুকাকুর উপস্থিতি ও চাপের কারণে সমতায় ফেরে দলটি। যদিও ফলাফল বাঁচানো গেছে; কিন্তু পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
বিশ্বকাপে শেষ তিন ম্যাচে জয়হীন থাকা বেলজিয়ামের জন্য এটি সতর্কবার্তা। অথচ এর আগের সময়টাতে তারা বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি ছিল। তাই কোচ রুদি গার্সিয়া জানেন, শুধু পয়েন্ট নয়, আত্মবিশ্বাস ফেরানোর জন্যও এই ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স দরকার। দলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। রোমেলু লুকাকু শুরু থেকেই খেলবেন কি না তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে। তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকলে চার্লস ডি কেটেলারে আক্রমণে দায়িত্ব নিতে পারেন। মাঝমাঠে সব নজর থাকবে কেভিন ডি ব্রুইনার দিকে, যিনি ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ এবং সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। দুই প্রান্তে গতি যোগ করবেন জেরেমি ডোকু ও লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড।
অন্য দিকে ইরান এবার বিশ্বকাপে এসেছে অনেক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে। মাঠের বাইরের নানা আলোচনা ও প্রস্তুতির জটিলতা সত্ত্বেও দলটি প্রথম ম্যাচে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে তারা। রামিন রেজাইয়ান ও মোহাম্মদ মাহেবির গোল শুধু একটি পয়েন্ট এনে দেয়নি বরং দলকে আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে যে তারা বড় দলগুলোর বিপক্ষেও লড়াই করতে পারে।
বিশ্বকাপে ইরানের ইতিহাস খুব বেশি উজ্জ্বল নয়। ছয়বার অংশ নিয়েও কখনো প্রথম পর্ব পেরোনো হয়নি। তবে বর্তমান দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের সংগঠিত ফুটবল, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ।
দলের সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক ও তারকা ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমি। দীর্ঘ দিন ধরে জাতীয় দলের আক্রমণের মুখ তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার গোলসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেয়ার সামর্থ্যও প্রমাণ করেছেন। তার সাথে সামনে থাকতে পারেন শাহরিয়ার মোগানলু, যিনি শারীরিক শক্তি ও অবস্থানগত খেলার জন্য পরিচিত।
রক্ষণে রামিন রেজাইয়ানের অভিজ্ঞতা এবং মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণও ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বেলজিয়ামের দ্রুত আক্রমণ ঠেকাতে তাদের রক্ষণকে প্রায় নিখুঁত থাকতে হবে।
দুই দলের সিনিয়র পর্যায়ে এটিই প্রথম মুখোমুখি লড়াই। ইতিহাস, র্যাংকিং ও তারকাসমৃদ্ধ দল সবকিছু বেলজিয়ামের দিকে ঝুঁকে থাকলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে চমকের গল্প বারবার লেখা হয়েছে। সেই সম্ভাবনাই ইরানকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
গ্রুপের সমীকরণ এতটাই সূক্ষ্ম যে একটি জয় পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয় অভিজ্ঞতা জেতে, নাকি লড়াকু মানসিকতা নতুন ইতিহাস লিখে।



