জসিম উদ্দিন রানা
মরুভূমি থেকে মহানগর, পাহাড় থেকে সমুদ্রতীর পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ আজ এক ভালোবাসার পতাকার নিচে একত্রিত হবে। ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, কিন্তু আবেগ এক-ফুটবল। এই খেলাই মানুষকে শেখায় স্বপ্ন দেখতে, অসম্ভবকে সম্ভব ভাবতে, আর পরাজয়ের মাঝেও আশার আলো খুঁজে নিতে। আগামী এক মাস পৃথিবীর ঘড়ি চলবে ভিন্ন ছন্দে। রাত জেগে চোখ থাকবে টেলিভিশনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যাবে তর্ক-বিতর্কে, আর প্রতিটি গোলের সঙ্গে কেঁপে উঠবে কোটি হৃদয়।
আজ শুধু একটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধন নয়। আজ শুরু হচ্ছে আবেগের মহাযাত্রা, স্বপ্নের মহাকাব্য, আনন্দ আর অশ্রুর এক বৈশ্বিক উৎসব। বিশ্বকাপ আবারো মনে করিয়ে দিতে এসেছে- পৃথিবী যত বিভক্তই হোক, একটি ফুটবলই পারে পুরো মানবজাতিকে এক সুতোয় গাঁথতে। স্বাগতম, ফুটবলের মহামঞ্চে। স্বাগতম, ২০২৬ বিশ্বকাপে। চার বছরের অপেক্ষার অবসান। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে জমে থাকা উত্তেজনা, স্বপ্ন আর আবেগের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আজ পর্দা উঠছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসরের। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা যৌথভাবে আয়োজন করছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে শুরু হতে যাওয়া এই মহারণ কেবল ফুটবল নয়, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, ঐতিহ্য আর বৈশ্বিক মিলনেরও এক অনন্য উৎসব।
আজ মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি এস্তাদিও আজতেকাতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাজবে বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি। স্থানীয় সময় ম্যাচ শুরুর প্রায় ৯০ মিনিট আগে শুরু হবে বর্ণাঢ্য আয়োজন। এরপর সহ-আয়োজক মেক্সিকো স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ও বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে। প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী এই বিশাল আয়োজনের ফাইনাল ১৯ জুলাই। ভেনু নিউ জার্সির ৮২ হাজার ৫০০ আসনবিশিষ্ট মেটলাইফ স্টেডিয়াম।
ফুটবল আর সঙ্গীতের মেলবন্ধনে তৈরি হবে এমন এক দৃশ্য, যা আয়োজকদের ভাষায় অতীতের সব বিশ্বকাপ উদ্বোধনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। মঞ্চ মাতাতে উপস্থিত থাকবেন বিশ্বসঙ্গীতের একঝাঁক তারকা। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ওদাই ওদাই পরিবেশন করবেন শাকিরা ও বার্না বয়। তাদের সাথে থাকবেন জে বালভিন, বেলিন্ডা, আলেজান্দ্রো ফার্নান্দেজ, টায়লা, মানসহ আরও অনেক শিল্পী। আলো, শব্দ, নৃত্য আর প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই আয়োজন।
প্রথম রাউন্ডে মোট ৭২টি ম্যাচ, বাদ পড়বে মাত্র ১২টি দল। নকআউট পর্বে উঠবে ৩২টি দল- প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতিটি ম্যাচে দুই অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে কুলিং ব্রেক থাকবে। নতুন নিয়মে সময় নষ্ট ঠেকাতে দলগুলোকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে বদলি সম্পন্ন করতে হবে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় কোনো খেলোয়াড় যদি হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলে লাল কার্ড দেখার ঝুঁকিতে থাকবেন।
এটি হয়তো শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে ফুটবলের কয়েকজন মহাতারকার। কোটি হৃদয়ের অধিপতি লিওনেল মেসি, পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ব্রাজিলের জাদুকর নেইমার কিংবা ক্রোয়েশিয়ার শিল্পীসুলভ মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ-সবাই ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। মেসি কি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতিয়ে সেরা ফুটবলার হওয়া নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারবেন? ৪১ বছর বয়সী রোনালদো সময়কে হার মানিয়ে প্রতিভাবান পর্তুগাল দলকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেবেন? অথবা হ্যারি কেনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড কি ১৯৬৬ সালের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারবেন? ফলে এই বিশ্বকাপ কেবল নতুন নায়কদের জন্মই দেবে না, বিদায় জানাতে পারে এক স্বর্ণযুগকে।
এবারের বিশ্বকাপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী উপস্থিতি। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৪টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধিত্ব দেখা যাচ্ছে এই আসরে। ফুটবল যে এখন সত্যিকার অর্থেই বিশ্বজনীন ভাষা, তার আরেকটি উজ্জ্বল প্রমাণ এটি। এশিয়া থেকে কাতার, সৌদি আরব, ইরান, ইরাক (৪০ বছর পর সুযোগ পেয়েছে), জর্ডান (প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলবে), উজবেকিস্তান (প্রথমবারের মতো যোগ্যতা অর্জন করেছে)। আফ্রিকা থেকে মরক্কো, মিসর, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট। ইউরোপ থেকে তুরস্ক (দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরল) ও বসনিয়া হার্জেগোভিনা।
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১,৬০০ ডলার। অথচ ২০২৬ সালে ফিফার বিক্রি করা সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ৩২,৯৭০ ডলার। ১০৪টি ম্যাচজুড়ে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা গেছে। ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক ম্যাচের টিকিট এখনও পুনর্বিক্রয় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই মূল্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রভাবও বিশ্বকাপের ওপর পড়েছে। ইরানের তিনটি গ্রুপ ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ার কথা, যার প্রথমটি ১৫ জুন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ইরান তাদের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনার টাকসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিহুয়নায় নিয়ে গেছে। খেলোয়াড়রা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পেলেও, দলের প্রায় ১৫ জন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কর্মীকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
অন্য দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল আসরের চিরন্তন আকর্ষণ টিকিটের আকাশছোঁয়া মূল্য নিয়ে ক্ষোভ, আমেরিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের ছায়াকে ছাপিয়ে যেতে পারবে বলে বিশ^াস রয়েছে ফিফার।



