মসলার আমদানি মূল্যের সাথে বাজার দরের বড় ফারাক

চোরাচালানির ফলে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব

Printed Edition
মসলার আমদানি মূল্যের সাথে বাজার দরের বড় ফারাক
মসলার আমদানি মূল্যের সাথে বাজার দরের বড় ফারাক

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

বাংলাদেশে মসলার বাজার নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এক দিকে ঘোষিত আমদানি মূল্য ও শুল্কমূল্যসহ মোট আমদানি মূল্যের সাথে বাজার দরের বড় ধরনের ফারাক। অন্য দিকে গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি কম। তবুও বাজারে মসলার যেমন ঘাটতি নেই, তেমনি গত দুই বছরের ব্যবধানে এলাচের দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মসলার বাজারের প্রায় এক- তৃতীয়াংশের বেশি জোগান হয় চোরাইপথে আসা মসলায়। এতে যেমন সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, পাশাপাশি বৈধ আমদানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কোনো ফাঁকি আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার গুয়েতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ভারত, পাকিস্তান, হন্ডুরাসসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মসলা আমদানি হয় আমাদের দেশে। আবার দুবাই হয়েও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের মসলা এ দেশে আসে। আমাদের দেশে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের মসলা আমদানি হয় বলেও সূত্র জানায়।

কমেছে আমদানি

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ কেজি এলাচ কম আমদানি হয়েছে। একই সময়ে জিরা কম আমদানি হয়েছে সাড়ে ১৩ লাখ কেজি, লবঙ্গ কম আমদানি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ কেজি।

কাস্টম সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি হতে এপ্রিল এই চার মাসে এলাচ আমদানি হয়েছিল পাঁচ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৪ কেজি (৫৮৭ মে.টন)। চলতি বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে চার লাখ ৪০ হাজার ১৪৩ কেজি (৪৪০ মে.টন)। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য বলছে চলতি বছরে আমদানিকৃত এলাচের এসেসমেন্ট ভ্যালু ৮২ কোটি পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭৪ টাকা। আমদানিকৃত এলাচের ওপর আরোপিত রাজস্বের পরিমাণ ২৬ কোটি ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার ১১৮ টাকা। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি কেজি এলাচের আমদানি ব্যয় পড়ে দুই হাজার ৪৬৬ টাকা।

২০২৫ সালের জানুয়ারি হতে এপ্রিল এই চার মাসে লবঙ্গ আমদানি হয়েছিল ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৫ কেজি (১২৪৬ মে.টন)। চলতি বছরের একই সময়ে লবঙ্গ আমদানি হয়েছে আট লাখ ২০ হাজার ৪২০ কেজি (৮২০ মে.টন)। চলতি বছরে আমদানিকৃত লবঙ্গের এসেসমেন্ট ভ্যালু (শুল্কায়ন মূল্য) ৪০ কোটি ৮৪ লাখ ৬২ হাজার ৮৮৬ টাকা। আমদানিকৃত লবঙ্গের ওপর আরোপিত রাজস্বের পরিমাণ ২১ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০৬ টাকা। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি কেজি লবঙ্গের আমদানি ব্যয় পড়ে ৭৬৫ টাকা।

২০২৫ সালের জানুয়ারি হতে এপ্রিল এই চার মাসে দারুচিনি আমদানি হয়েছিল ৩৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৮৭ কেজি (৩৬৪৬ মে.টন)। চলতি বছরের একই সময়ে দারুচিনি আমদানি হয়েছে ৫২ লাখ ৬২ হাজার ৭১০ কেজি (৫২৬২ মে.টন)। চলতি বছরে আমদানিকৃত দারুচিনির এসেসমেন্ট ভ্যালু (শুল্কায়ন মূল্য) ১১২ কোটি ৫৯ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টাকা। আমদানিকৃত দারুচিনির ওপর আরোপিত রাজস্বের পরিমাণ ৬০ কোটি ৩৮ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪২ টাকা। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি কেজি দারুচিনির আমদানি ব্যয় পড়ে ৩২৮ টাকা।

২০২৫ সালের জানুয়ারি হতে এপ্রিল এই চার মাসে জিরা আমদানি হয়েছিল ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯৬ কেজি (২৪৫৫ মে.টন)। চলতি বছরের একই সময়ে জিরা আমদানি হয়েছে ১১ লাখ তিন হাজার দুই কেজি (১১০৩ মে.টন)। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি কেজি জিরার আমদানি ব্যয় পড়ে ৬৬৯ টাকা এবং প্রতি কেজি গোলমরিচের আমদানি ব্যয় পড়ে ৬৮৩ টাকা।

আমদানি মূল্যের সাথে বাজার মূল্যের বড় ধরনের ফারাক

খুচরা বাজারে গতকাল দারুচিনি প্রতি কেজি ৭১০ টাকা, প্রতি কেজি লবঙ্গ ১৬৫০ টাকা, জিরা প্রতি কেজি ৭২০ টাকা, এলাচ প্রতি কেজি চার হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা, বাজারে নতুন আসা মার্কিন এলাচের দাম কিছুটা কম অর্থাৎ প্রতি কেজি তিন হাজার আট শ’ টাকায়ও মিলছে বলে সূত্র জানায়।

এ দিকে গতকাল সোমবার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি এলাচ তিন হাজার সাত শ’ ২০ টাকা থেকে চার হাজার এক শ’ টাকা পর্যন্ত, দারুচিনি প্রতি কেজি ৩৬০-৪১০ টাকা, লবঙ্গ প্রতি কেজি ১২৬৫ টাকা, গোলমরিচ প্রতি কেজি ৯৮০ টাকা ও সাদা গোলমরিচ ১১৯০ টাকা এবং প্রতি কেজি জিরা ৫১৫-৫৩০ টাকা দরে বিক্রি হয় বলে জানান হাজী জসিম ট্রেডার্সের কর্মকর্তা জিহান।

টিসিবির তথ্য যা বলছে

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয় সর্বনিম্ন এক হাজার ৯ শ’ থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার আট শ’ টাকা দরে। কিন্তু কয়েকমাস না যেতেই কোরবানি সামনে রেখে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এলাচের দাম। এরপর ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় গিয়ে স্থির হয় এলাচের দাম।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১০ মে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয় সর্বনিম্ন তিন হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার আট শ’ টাকায়। একই দিনে লবঙ্গ বিক্রি হয় প্রতি কেজি ১৬০০-১৮০০ টাকা, দারুচিনি প্রতি কেজি ৫০০-৫৫০ টাকা, জিরা প্রতি কেজি ৬৫০-৮৫০ টাকা।

২০২৫ সালের ১০ মে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয় সর্বনিম্ন চার হাজার ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায়। একই দিনে লবঙ্গ বিক্রি হয় প্রতি কেজি ১৩৬০-১৬০০ টাকা, দারুচিনি প্রতি কেজি ৫০০-৫৮০ টাকা, জিরা প্রতি কেজি ৬৫০-৭৫০ টাকা।

২০২৬ সালের ১০ মে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয় সর্বনিম্ন চার হাজার ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায়। একই দিনে লবঙ্গ বিক্রি হয় প্রতি কেজি ১৪০০-১৬০০ টাকা, দারুচিনি প্রতি কেজি ৫০০-৬০০ টাকা, জিরা প্রতি কেজি ৬০০-৭০০ টাকা।

আন্ডার ইনভেয়েসিং না অন্য কিছু?

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য অনুযায়ী আমদানিকৃত মসলার শুল্কায়ন মূল্য এবং প্রযোজ্য রাজস্ব যোগ করে যে পরিমাণ আমদানি মূল্য দাঁড়ায় তা বাজার দরের চাইতে অনেক কম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই আমদানি মূল্যের চাইতে বাজার দরের বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যে রেটে মসলার এলসি খোলা হয়, তা আন্তর্জাতিক বাজার দরের চাইতে কম। ফলে বাড়তি টাকা অবৈধ মাধ্যমে সেখানে পৌঁছানো হয়। ফলে এক দিকে প্রকৃত মূল্য আড়ালেই থেকেই যায়। অন্য দিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে হাতবদল হয় এমন অভিযোগ রয়েছে।

চোরাইপথেই আসে এক-তৃতীয়াংশের বেশি

আমদানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে বিক্রি হওয়া গরম মসলার বিশাল একটি অংশই আসে চোরাইপথে। আমদানি পর্যায়ে উচ্চ শুল্ক থাকায় মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই চোরাইপথে এ দেশে আনা হয়। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তরক্ষী বিজিবির হাতে কিছু মসলা ধরা পড়লেও তা তুলনামূলকভাবে একেবারেই নগণ্য বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কয়েক বছর আগে ট্যারিফ কমিশন জানিয়েছিল জিরা, এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গ বছরের পর বছর ধরে চাহিদার তুলনায় কম আমদানি হয়ে থাকে। সংস্থাটি সে সময় জানিয়েছিল চাহিদার তুলনায় আমদানি ঘাটতি ৪৩ শতাংশ, যা অনানুষ্ঠানিক বা অন্য কোনো উপায়ে (চোরাচালান বা মিথ্যা ঘোষণা) আমদানি হচ্ছে।

এসব বিষয়ে একাধিক আমদানিকারকের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। শুধু এটুকু বলেছেন, এলসি পেমেন্ট, লোডিং-আনলোডিং চার্জ এবং স্টোরেজ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা ব্যয়, যা কাস্টমসের হিসাবে ধরা হয় না।